জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে চট্টগ্রামে ওয়াসিম আকরামসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২২ জুন দিন ধার্য করেছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এদিন মামলাটিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা ছিল। তবে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের একজন ফজলে করিমকে আদালতে হাজির করা সম্ভব না হওয়ায় নির্ধারিত শুনানি সম্পন্ন হয়নি এবং নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানিতে অংশ নেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। তিনি আদালতকে জানান, অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য দিন ধার্য থাকলেও ফজলে করিমকে আদালতে আনা হয়নি। ফলে শুনানি কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের কাছে কিছু সময় চেয়ে আবেদন জানায়। প্রসিকিউটর বলেন, আসামিকে আদালতে হাজির করা গেলে শুনানি কার্যক্রম সম্পন্ন করা সহজ হবে। এ কারণে নতুন তারিখ নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
ফজলে করিমের অনুপস্থিতি নিয়ে আদালতে বিস্তারিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। তিনি বলেন, কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ফজলে করিম বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তবে চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ফজলে করিম মূলত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। এসব সমস্যার কারণে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে ভর্তি থাকার মতো গুরুতর পরিস্থিতি নথিপত্রে প্রতীয়মান হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের এ বক্তব্যের বিপরীতে ফজলে করিমের আইনজীবী এম হাসান ইমাম ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি আদালতকে জানান, তার মক্কেল বয়সজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে।
আইনজীবীর দাবি অনুযায়ী, একদিন ট্রাইব্যুনাল থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় ফজলে করিম দুর্ঘটনার শিকার হন। ওই ঘটনায় তার ঘাড়ে গুরুতর আঘাত লাগে এবং ঘাড়ের একটি হাড় ভেঙে যায় বলে তিনি আদালতকে অবহিত করেন।
ফজলে করিমের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় শুনানির জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন বলে দাবি করেন তার আইনজীবী। তিনি বলেন, চিকিৎসা এবং শারীরিক সুস্থতার বিষয়টি নিশ্চিত না করে বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।
এদিকে মামলাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আদালতের সামনে তুলে ধরেন রাষ্ট্রনিযুক্ত প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা। তারা অভিযোগ করেন, মামলার প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র এখনো তাদের কাছে সরবরাহ করা হয়নি।
স্টেট ডিফেন্স হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন, আবুল হাসান, ইশরাত জাহান ও মোহাম্মদ এনাম আদালতে বলেন, পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র না পেলে মামলার বিষয়ে যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব নয়। এতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে প্রতিরক্ষা পক্ষের এই অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় রাষ্ট্রপক্ষ। প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন আদালতকে জানান, মামলার প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের কোনো ঘাটতি নেই।
রাষ্ট্রপক্ষ ও প্রতিরক্ষা পক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য শোনার পর ট্রাইব্যুনাল বিষয়টি বিবেচনায় নেয়। পরে আদালত অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ২২ জুন নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
বৃহস্পতিবার সকালে মামলার চারজন আসামিকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন যুবলীগ নেতা আজিজুর রহমান, তৌহিদুল ইসলাম, মো. ফিরোজ এবং দেবাশীষ পাল দেবু।
আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বাড়তি উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে।
এর আগে গত ১৩ মে মামলার পলাতক ১৭ আসামির পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ৪ জুন দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল।
মামলাটিতে মোট ২২ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও অধিকাংশ আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন বলে আদালতে উপস্থাপিত তথ্য থেকে জানা যায়।
পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। এছাড়া সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও এই মামলার অন্যতম আসামি।
মামলার অন্য পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দীন এবং সাবেক মেয়র রেজাউল করিম। তাদের বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া মহিউদ্দিন বাচ্চু, হেলাল আকবর, নুরুল আজিম রনি, শৈবাল দাশ সুমন, আবু ছালেক, এসবারুল হক এবং এইচ এম মিঠুর নামও আসামির তালিকায় রয়েছে।
পলাতক আসামিদের মধ্যে আরও রয়েছেন নূর মোস্তফা টিনু, জমির উদ্দিন, ইমরান হাসান মাহমুদ, জাকারিয়া দস্তগীর, মহিউদ্দিন ফরহাদ এবং সুমন দে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ। গত ৭ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-২ তিনটি পৃথক অভিযোগে ২২ জনের বিরুদ্ধে আনা ফরমাল চার্জ আমলে নেন।
এর আগে গত ৫ এপ্রিল প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র বা ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়। তদন্ত শেষে সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এই অভিযোগ আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
মামলার প্রথম অভিযোগে ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং মো. ফারুককে হত্যার দায় আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ঘটনাগুলোর সঙ্গে এসব হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগে তানভীর সিদ্দিকী, সায়মন ওরফে মাহিম এবং হৃদয় চন্দ্রকে হত্যার দায় আনা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, এসব ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের উপাদান বিদ্যমান রয়েছে।
তৃতীয় অভিযোগে শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, বরং শতাধিক মানুষকে গুরুতর আহত করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে জাহিদ হাসান, আবদুল কাদের, আছিয়া খাতুন, সানজিদা সুলতানা এবং আবদুল্লাহর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ওই সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় বহু মানুষ আহত হন। তদন্ত প্রতিবেদনে শতাধিক আহত ব্যক্তির তথ্য ও ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনার বিচার কার্যক্রম বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের এই মামলাটি অন্যতম আলোচিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আগামী ২২ জুন নির্ধারিত শুনানিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে বলে আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা। তবে আসামিদের উপস্থিতি, নথিপত্র সংক্রান্ত বিষয় এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার ওপর পরবর্তী অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।

























