কোরবানির ঈদ বা সাধারণ সময়ে বাজার থেকে গরু কেনার ক্ষেত্রে একটি বড় চিন্তার বিষয় হলো—গরুটি সুস্থ তো? বেশি লাভের আশায় অনেক অসাধু ব্যবসায়ী স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর হরমোন ইনজেকশন দিয়ে গরুকে দ্রুত মোটাতাজা করে থাকেন। এসব গরুর মাংস মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, যা থেকে কিডনি ও লিভারের জটিলতা এমনকি ক্যান্সারের মতো রোগও হতে পারে।
একটু সতর্ক হলে এবং কিছু কৌশল জানা থাকলে খুব সহজেই কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরু চেনা যায়। আপনার আর্টিকেলের জন্য নিচে একটি বিস্তারিত এবং সাজানো গাইডলাইন দেওয়া হলো:
স্টেরয়েড দিয়ে মোটাতাজা করা গরু চেনার সহজ উপায়
কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরু চেনার জন্য পশু বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। হাটে গিয়ে গরুর শারীরিক গঠন ও আচরণের দিকে একটু খেয়াল করলেই বিষয়টি ধরা পড়ে। নিচে এর সবচেয়ে সহজ কয়েকটি উপায় আলোচনা করা হলো:
১. আঙুলের চাপ পরীক্ষা (সবচেয়ে কার্যকর উপায়)
স্টেরয়েড দেওয়া হলে গরুর শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে যায়, যার কারণে গরুকে দেখতে মোটা ও নাদুসনুদুস লাগে।
-
কীভাবে বুঝবেন: গরুর পেছনের দিকে বা পাঁজরের মাংসে আঙুল দিয়ে শক্ত করে চাপ দিন। যদি দেখেন আঙুল বসে গিয়ে গর্ত হয়ে গেছে এবং মাংস আগের অবস্থায় ফিরে আসতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় নিচ্ছে, তবে নিশ্চিত থাকুন গরুটি কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা হয়েছে।
-
সুস্থ গরুর ক্ষেত্রে: সুস্থ গরুর মাংসে চাপ দিলে তা রাবারের মতো দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।

২. গরুর আচরণ ও চঞ্চলতা
সুস্থ গরু কখনোই এক জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে না।
-
অসুস্থ বা স্টেরয়েড দেওয়া গরু: এরা অত্যন্ত শান্ত, ক্লান্ত ও বিষণ্ণ থাকে। অতিরিক্ত ওজনের কারণে এরা নড়াচড়া করতে চায় না, সারাক্ষণ এক জায়গায় ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে বা শুয়ে থাকতে পছন্দ করে। এমনকি গায়ে হাত দিলেও এরা তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না।
-
সুস্থ গরু: সুস্থ গরু সবসময় চঞ্চল থাকে। লেজ দিয়ে মাছি তাড়ায়, কান নাড়ে, আশেপাশের পরিবেশের প্রতি সতর্ক থাকে এবং মানুষ দেখলে অনেক সময় ভয় পায় বা তেড়ে আসার চেষ্টা করে।
৩. অস্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস ও লালা
স্টেরয়েড বা ওষুধের প্রভাবে গরুর ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, বিশেষ করে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
-
কীভাবে বুঝবেন: খেয়াল করুন গরুটি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছে কি না। কৃত্রিমভাবে মোটা করা গরু অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠে এবং দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়। এদের মুখ দিয়ে অনবরত অতিরিক্ত লালা ঝরতে থাকে।
৪. উরু ও পেছনের অংশের গঠন
গরুর পেছনের দিকটা খেয়াল করা খুবই জরুরি।
-
অস্বাভাবিক ফোলাভাব: ইনজেকশন বা বড়ি খাওয়ানো গরুর পেছনের দিক, বিশেষ করে উরু বা রানের পেশি অস্বাভাবিকভাবে ফুলে থাকে। এই ফোলা অংশটি থলথলে বা নরম হয়, মনে হবে যেন ভেতরে বাতাস বা পানি জমে আছে।
-
সুস্থ গরুর ক্ষেত্রে: প্রাকৃতিকভাবে বড় হওয়া গরুর পেশি থাকে শক্ত, সুঠাম এবং টানটান। এদের হাড্ডি ও মাংসের মাঝে একটি স্বাভাবিক অনুপাত থাকে।
৫. খাদ্যাভ্যাস ও জাবর কাটা
খাবার খাওয়ার ধরন দেখেও সুস্থতা বোঝা যায়।
-
খাবারে অনীহা: স্টেরয়েড দেওয়া গরু স্বাভাবিক খাবার যেমন ঘাস, খড় বা ভুসি খেতে চায় না। এদের সামনে খাবার দিলে এরা মুখ ফিরিয়ে নেয়।
-
সুস্থ গরু: সুস্থ গরু সুযোগ পেলেই খাবার খাবে এবং অবসর সময়ে বসে বসে অনবরত জাবর কাটবে। জাবর কাটা সুস্থ পশুর অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
৬. নাক ও চামড়ার অবস্থা
-
নাকের শুষ্কতা: সুস্থ গরুর নাকের ওপরের অংশ (মাজল) হালকা ভেজা থাকে বা সেখানে বিন্দু বিন্দু শিশিরের মতো ঘাম দেখা যায়। কিন্তু অসুস্থ বা স্টেরয়েড দেওয়া গরুর নাক একদম শুকনা ও খসখসে থাকে।
-
চামড়ার উজ্জ্বলতা: কৃত্রিমভাবে মোটা করা গরুর চামড়া খুব চকচকে ও টানটান দেখালেও তা আসলে ভেতরের পানি জমার কারণে হয়।
হাট থেকে পশু কেনার সময় অতিরিক্ত চকচকে, নাদুসনুদুস ও শান্ত গরুর চেয়ে মাঝারি আকৃতির, চঞ্চল ও দেশি জাতের গরু বেছে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্য না দেখে, গরুর সুস্থতা নিশ্চিত করাটা আপনার এবং আপনার পরিবারের সুস্বাস্থ্যের জন্যই অত্যন্ত জরুরি।


























