ঢাকা ১১:২১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খাওয়ার পর পেটব্যথা কেন হয়? জানুন কারণ ও করণীয়

খাওয়ার পর পেটব্যথা

খাবার খাওয়ার পর পেটে ব্যথা, জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি অনেকের কাছেই পরিচিত একটি সমস্যা। কারও ক্ষেত্রে এটি সাময়িক বদহজমের কারণে হলেও, অনেক সময় এটি গ্যাস্ট্রিক, আলসার, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, পিত্তথলির সমস্যা কিংবা অন্ত্রের জটিল রোগের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি প্রায় প্রতিবার খাবার খাওয়ার পরই পেটব্যথা হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

চিকিৎসকদের মতে, খাবার খাওয়ার পরপরই শরীরের পরিপাকতন্ত্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। পাকস্থলীতে অ্যাসিড নিঃসরণ বাড়ে, হজমে সহায়তা করতে বিভিন্ন অঙ্গ একসঙ্গে কাজ শুরু করে এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক সংকোচন শুরু হয়। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার যেকোনো ধাপে সমস্যা দেখা দিলে পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।

ব্যথার ধরন, কোথায় ব্যথা হচ্ছে, কতক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে এবং কোন ধরনের খাবারের পর সমস্যা বাড়ছে—এসব তথ্য রোগ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই চিকিৎসকের কাছে গেলে এসব বিষয় বিস্তারিত জানানো প্রয়োজন।

খাবারের পর বুকের নিচে জ্বালাপোড়া বা উপরের পেটে ব্যথা হলে এর অন্যতম কারণ হতে পারে গ্যাস্ট্রাইটিস। পাকস্থলীর ভেতরের আবরণে প্রদাহ সৃষ্টি হলে খাবার খাওয়ার পর অ্যাসিডের প্রভাবে ব্যথা আরও বেড়ে যায়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি আলসারে রূপ নিতে পারে।

অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) থাকলেও খাবারের পর বুকজ্বালা ও পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালীতে উঠে আসে, যার ফলে বুক জ্বালা, টক ঢেকুর এবং কখনো গলা পর্যন্ত জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়।

পাকস্থলীর আলসারও খাবারের পর পেটব্যথার একটি সাধারণ কারণ। আলসার থাকলে খাবারের পর অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে ক্ষতস্থানে জ্বালা সৃষ্টি করে। অনেক সময় ব্যথার সঙ্গে বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা কিংবা কালো পায়খানার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর যদি পেটের ডান পাশের ওপরের অংশে তীব্র ব্যথা শুরু হয়, তাহলে পিত্তথলিতে পাথর বা পিত্তথলির প্রদাহের সম্ভাবনা থাকতে পারে। এই ব্যথা কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এবং কখনো কাঁধ বা পিঠেও ছড়িয়ে যেতে পারে।

অন্ত্রের কিছু দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাও খাবারের পর ব্যথার কারণ হতে পারে। ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS) থাকলে খাওয়ার পর পেটে মোচড়, গ্যাস, পেট ফাঁপা এবং মলত্যাগের তাগিদ বাড়তে পারে। অন্যদিকে ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ (IBD) থাকলে অন্ত্রে প্রদাহের কারণে ব্যথা আরও তীব্র হতে পারে।

অনেকের শরীর নির্দিষ্ট খাবার সহজে হজম করতে পারে না। যেমন ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকলে দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, গ্যাস, ডায়রিয়া ও পেটব্যথা হতে পারে। একইভাবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গ্লুটেন বা অন্যান্য খাদ্য উপাদানের প্রতিও অসহিষ্ণুতা দেখা যায়।

খাবারের পর তলপেটে ব্যথা অনেক সময় কোলনের স্বাভাবিক সংকোচনের কারণেও হতে পারে। হজম প্রক্রিয়ার সময় কোলন নতুন খাবারের জন্য জায়গা তৈরি করতে সংকুচিত হয়। এ সময় গ্যাস আটকে গেলে ব্যথা বা খিঁচুনি অনুভূত হতে পারে। কোলাইটিস বা ডাইভার্টিকুলার রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও বেশি দেখা যায়।

খাবার খুব দ্রুত খাওয়া, ভালোভাবে না চিবিয়ে গিলে ফেলা, অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া এবং একবারে অনেক বেশি খাবার গ্রহণের কারণেও পেটে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের অভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে হজমের সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, ধীরে ধীরে খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা, অতিরিক্ত তেল-চর্বি ও ঝাল খাবার কম খাওয়া এবং নিয়মিত ব্যায়াম করলে হজমশক্তি ভালো থাকে। একই সঙ্গে ধূমপান ও অতিরিক্ত চা-কফি গ্রহণ কমানোও উপকারী।

যদি খাবারের পর নিয়মিত তীব্র পেটব্যথা হয়, বমি, জ্বর, রক্তমিশ্রিত পায়খানা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া বা দীর্ঘদিনের অস্বস্তি থাকে, তাহলে দেরি না করে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।

মনে রাখতে হবে, খাবারের পর মাঝে মাঝে হালকা অস্বস্তি হওয়া স্বাভাবিক হলেও বারবার একই সমস্যা দেখা দেওয়া শরীরের একটি সতর্ক সংকেত হতে পারে। তাই লক্ষণগুলোকে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করলে সুস্থ থাকা এবং বড় ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

জনপ্রিয় সংবাদ

খাওয়ার পর পেটব্যথা কেন হয়? জানুন কারণ ও করণীয়

Update Time : ০৯:২৪:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

খাবার খাওয়ার পর পেটে ব্যথা, জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি অনেকের কাছেই পরিচিত একটি সমস্যা। কারও ক্ষেত্রে এটি সাময়িক বদহজমের কারণে হলেও, অনেক সময় এটি গ্যাস্ট্রিক, আলসার, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, পিত্তথলির সমস্যা কিংবা অন্ত্রের জটিল রোগের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি প্রায় প্রতিবার খাবার খাওয়ার পরই পেটব্যথা হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

চিকিৎসকদের মতে, খাবার খাওয়ার পরপরই শরীরের পরিপাকতন্ত্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। পাকস্থলীতে অ্যাসিড নিঃসরণ বাড়ে, হজমে সহায়তা করতে বিভিন্ন অঙ্গ একসঙ্গে কাজ শুরু করে এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক সংকোচন শুরু হয়। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার যেকোনো ধাপে সমস্যা দেখা দিলে পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।

ব্যথার ধরন, কোথায় ব্যথা হচ্ছে, কতক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে এবং কোন ধরনের খাবারের পর সমস্যা বাড়ছে—এসব তথ্য রোগ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই চিকিৎসকের কাছে গেলে এসব বিষয় বিস্তারিত জানানো প্রয়োজন।

খাবারের পর বুকের নিচে জ্বালাপোড়া বা উপরের পেটে ব্যথা হলে এর অন্যতম কারণ হতে পারে গ্যাস্ট্রাইটিস। পাকস্থলীর ভেতরের আবরণে প্রদাহ সৃষ্টি হলে খাবার খাওয়ার পর অ্যাসিডের প্রভাবে ব্যথা আরও বেড়ে যায়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি আলসারে রূপ নিতে পারে।

আরও পড়ুন  প্রেশার কুকারে তেজপাতা দিলে কি বিস্ফোরণ হতে পারে?

অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) থাকলেও খাবারের পর বুকজ্বালা ও পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালীতে উঠে আসে, যার ফলে বুক জ্বালা, টক ঢেকুর এবং কখনো গলা পর্যন্ত জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়।

পাকস্থলীর আলসারও খাবারের পর পেটব্যথার একটি সাধারণ কারণ। আলসার থাকলে খাবারের পর অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে ক্ষতস্থানে জ্বালা সৃষ্টি করে। অনেক সময় ব্যথার সঙ্গে বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা কিংবা কালো পায়খানার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর যদি পেটের ডান পাশের ওপরের অংশে তীব্র ব্যথা শুরু হয়, তাহলে পিত্তথলিতে পাথর বা পিত্তথলির প্রদাহের সম্ভাবনা থাকতে পারে। এই ব্যথা কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এবং কখনো কাঁধ বা পিঠেও ছড়িয়ে যেতে পারে।

আরও পড়ুন  আজ আন্তর্জাতিক পরী দিবস: শৈশবের জাদুময় স্মৃতির উদযাপন

অন্ত্রের কিছু দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাও খাবারের পর ব্যথার কারণ হতে পারে। ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS) থাকলে খাওয়ার পর পেটে মোচড়, গ্যাস, পেট ফাঁপা এবং মলত্যাগের তাগিদ বাড়তে পারে। অন্যদিকে ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ (IBD) থাকলে অন্ত্রে প্রদাহের কারণে ব্যথা আরও তীব্র হতে পারে।

অনেকের শরীর নির্দিষ্ট খাবার সহজে হজম করতে পারে না। যেমন ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকলে দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, গ্যাস, ডায়রিয়া ও পেটব্যথা হতে পারে। একইভাবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গ্লুটেন বা অন্যান্য খাদ্য উপাদানের প্রতিও অসহিষ্ণুতা দেখা যায়।

খাবারের পর তলপেটে ব্যথা অনেক সময় কোলনের স্বাভাবিক সংকোচনের কারণেও হতে পারে। হজম প্রক্রিয়ার সময় কোলন নতুন খাবারের জন্য জায়গা তৈরি করতে সংকুচিত হয়। এ সময় গ্যাস আটকে গেলে ব্যথা বা খিঁচুনি অনুভূত হতে পারে। কোলাইটিস বা ডাইভার্টিকুলার রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও বেশি দেখা যায়।

খাবার খুব দ্রুত খাওয়া, ভালোভাবে না চিবিয়ে গিলে ফেলা, অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া এবং একবারে অনেক বেশি খাবার গ্রহণের কারণেও পেটে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের অভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে হজমের সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

আরও পড়ুন  রাসায়নিকমুক্ত পাকা পেঁপে চেনার ৬ সহজ উপায়

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, ধীরে ধীরে খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা, অতিরিক্ত তেল-চর্বি ও ঝাল খাবার কম খাওয়া এবং নিয়মিত ব্যায়াম করলে হজমশক্তি ভালো থাকে। একই সঙ্গে ধূমপান ও অতিরিক্ত চা-কফি গ্রহণ কমানোও উপকারী।

যদি খাবারের পর নিয়মিত তীব্র পেটব্যথা হয়, বমি, জ্বর, রক্তমিশ্রিত পায়খানা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া বা দীর্ঘদিনের অস্বস্তি থাকে, তাহলে দেরি না করে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।

মনে রাখতে হবে, খাবারের পর মাঝে মাঝে হালকা অস্বস্তি হওয়া স্বাভাবিক হলেও বারবার একই সমস্যা দেখা দেওয়া শরীরের একটি সতর্ক সংকেত হতে পারে। তাই লক্ষণগুলোকে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করলে সুস্থ থাকা এবং বড় ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব।