ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানিয়ে স্লোগান দেওয়া হয়েছে। রোববার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে আয়োজিত এই বিশাল অনুষ্ঠানে শোকের পাশাপাশি প্রতিশোধের দাবিও জোরালোভাবে উঠে আসে। কবি মোহাম্মদ রাসুলির বক্তব্যের পর উপস্থিত জনতার বড় একটি অংশ করতালির মাধ্যমে তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন জানায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এতদিন তাঁর দাফন স্থগিত ছিল। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকের অংশ হিসেবে এখন জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হচ্ছে।
তেহরানের বৃহত্তম ধর্মীয় কমপ্লেক্স গ্র্যান্ড মোসাল্লায় জানাজাকে ঘিরে হাজারো মানুষ আগের রাত থেকেই অবস্থান নেন। সকাল হওয়ার আগেই পুরো এলাকা মানুষের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে যায়। অনেকের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির ছবি এবং প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত লাল পতাকা।
শনিবারের তুলনায় রোববার মানুষের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আয়োজকরা এটিকে শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং জাতীয় ঐক্য ও প্রতিরোধের বার্তা হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁদের দাবি, এই বিশাল জনসমাগমের মাধ্যমে বিশ্বকে জানানো হয়েছে যে ইরান এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
জানাজা শুরুর আগে আয়োজিত কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে কবি মোহাম্মদ রাসুলি বলেন, “এখন থেকে কাফনের কাপড়ই আমাদের পোশাক। আপনার রক্তের কসম, ট্রাম্পকে হত্যা করা এখন আমাদের দায়িত্ব।” তাঁর এই বক্তব্য মুহূর্তেই পুরো অনুষ্ঠানস্থলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, “যে ব্যক্তি আমাদের ইমামকে হত্যা করেছেন, আমরা কেন তাঁকে হত্যা করব না? তা না করা আমাদের জন্য কলঙ্কের।” তাঁর এই বক্তব্যকে সরকার অনুমোদিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখা হলেও উপস্থিত জনতার প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। তবে অধিকাংশ মানুষ করতালির মাধ্যমে বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।
আর্মেনিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত খলিল শিরঘোলামি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, মানুষকে হত্যা করা গেলেও তাঁর আদর্শকে হত্যা করা যায় না। তিনি মন্তব্য করেন, খামেনিকে হত্যা করা হলেও তাঁর আদর্শ আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়বে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনাও করেন।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলকাদর বলেন, জনগণ তাঁদের নেতাকে বিদায় জানাতে দুটি বিষয় সামনে এনেছেন। একটি হলো শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, অন্যটি শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার। তাঁর বক্তব্যেও প্রতিশোধের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
মূল জানাজার নামাজে ইমামতি করেন কোম শহরের ৯৭ বছর বয়সী প্রবীণ আলেম আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি। শুধু খামেনি নন, তাঁর পরিবারের আরও তিন সদস্যের জানাজাও একই অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানি।
অনুষ্ঠানে ছোট্ট নাতনির কফিন উপস্থিত অনেক মানুষকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। পুরো জানাজার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য হিসেবে এটিকেই উল্লেখ করেছেন অনেক অংশগ্রহণকারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
খামেনির মৃত্যুর পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আলোচিত বিষয়। তাঁর তিন ভাই মুস্তফা, মাসুদ ও মেসাম বাবার কফিনের পাশে উপস্থিত থাকলেও মোজতবাকে কোথাও দেখা যায়নি। এতে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাবার মৃত্যুর ১০ দিনের মাথায় সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হলেও গত তিন মাসে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। এমনকি নিজের স্ত্রীর জানাজাতেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক হামলায় তিনি আহত হলেও বর্তমানে তাঁর স্থায়ী কোনো শারীরিক ক্ষতি হয়নি।
জানাজায় ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদি এবং আল-কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানিকেও প্রকাশ্যে দেখা যায়। যুদ্ধের শুরুতে এমন উপস্থিতি কল্পনা করা কঠিন ছিল বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন রক্ষণশীল ব্যক্তিত্বের মন্তব্যও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্পের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী লরা লুমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানাজাকে একটি সহজ লক্ষ্যবস্তু বলে মন্তব্য করেন। মার্কিন ভাষ্যকার মার্ক লেভিনও এটিকে হাতছাড়া হওয়া একটি সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
গ্র্যান্ড মোসাল্লার চারপাশ মোজতবা খামেনি ও তাঁর বাবার ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছিল। বিভিন্ন স্টলে মোজতবার বক্তব্যের সংকলনও বিতরণ করা হয়। কফিনের পাশে রাখা বার্তাগুলোর মধ্যে ইংরেজিতে লেখা “কিল ট্রাম্প” স্লোগানটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে।
প্রায় ৩০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন চত্বরটি ভোরের আগেই পূর্ণ হয়ে যায়। ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যেও অনেকেই লাল পতাকা হাতে স্লোগান দেন, “কোনো আপস নয়, কোনো আত্মসমর্পণ নয়, কেবলই প্রতিশোধ।” কয়েকজন পুরুষ সাদা কাফনের কাপড় পরে উপস্থিত হন, যা নিজেদের জীবন উৎসর্গের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।



























