খামেনির দাফনের দিন ইরানের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিস্ফোরণের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র জানিয়ে দিয়েছে, সাম্প্রতিক এসব হামলার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, হামলার পেছনে আসলে কারা রয়েছে এবং এই ঘটনার মাধ্যমে নতুন কোনো সংঘাতের সূচনা হতে যাচ্ছে কি না।
ইরানের সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বুশেহর এবং এর পাশের শহর চোগাদাক এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বুশেহরে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা থাকায় ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে আন্তর্জাতিক মহলের নজর কাড়ে।
একই সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের কোনারক শহরেও অন্তত তিনটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। তবে এসব বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিংবা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিস্ফোরণের কিছুক্ষণ পরই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানায়, গত কয়েক ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনা করেনি। ওয়াশিংটনের এই বক্তব্য নতুন করে নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে।
এদিকে বুশেহরের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক ডেপুটি গভর্নর এহসান জাহানিয়ান বলেছেন, বিস্ফোরণের শব্দ মূলত বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর দাবি, শহরের উপকণ্ঠে একটি সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্রজাতীয় একটি বস্তু আঘাত হেনেছিল।
তবে ওই প্রজেক্টাইল কোথা থেকে এসেছে কিংবা কে এটি নিক্ষেপ করেছে, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে হামলার প্রকৃত উৎস নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
ঘটনার পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। দুই নেতা নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং পারস্য উপসাগরে চলমান ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে।
নেতানিয়াহু একই দিনে দক্ষিণ ইসরায়েলের হাতজেরিম বিমানঘাঁটিতে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এখনো শেষ হয়নি। তাঁর ভাষায়, সামনে আরও নতুন চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং ইসরায়েলকে সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ইয়াল জামিরও একই ধরনের বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শেষ হয়নি এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন পরিকল্পনা ইতোমধ্যে প্রস্তুত রয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও হামলা চালাতে ইসরায়েল প্রস্তুত এবং দেশটির সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার পর থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ইরান দাবি করছে, ওই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে তাদের নির্ধারিত রুট অনুসরণ করতে হবে।
অন্যদিকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলো এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। কাতার, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানেও বড় ধরনের মতবিরোধ রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে চাইলেও ইরান নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে—এমন কোনো পদক্ষেপে সম্মত নয়।
এরই মধ্যে ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় মন্তব্য করেছেন এবং তেহরানের ওপর দেওয়া কিছু অর্থনৈতিক ছাড়ও প্রত্যাহার করেছেন। তবে শান্তি আলোচনা পুরোপুরি ভেঙে গেছে—এমন ঘোষণা এখনো কোনো পক্ষ দেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও বড় ধরনের সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে খামেনির দাফনকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংবেদনশীল পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক আলোচনাকেও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
আগামী সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সর্বশেষ বিস্ফোরণ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সেই বৈঠক আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।


























