ঢাকা ০৬:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo হামে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১০ হাজার ছাড়াল দেশে Logo নাঈম হাসানকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা: তদন্ত দাবিতে এবি পার্টির উদ্বেগ Logo রোনালদোর জবাবেই থামল বিতর্ক, বিশ্বকাপের আগে আত্মবিশ্বাসী Logo প্রিমিয়ার লিগে নতুন নিয়ম: চুল টানলেই আর লাল কার্ড নয় Logo সৈয়দ আব্দুল হাদীকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, দেশপ্রেমের আহ্বানে আবেগঘন সন্ধ্যা Logo মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশ, নেইমার ছাড়াই চমক Logo বিশ্বকাপে ভিএআরের নতুন ইতিহাস, ‘ভুল পরিচয়’ শনাক্তে নজির Logo ভিনিসিয়ুসের হুঁশিয়ারি: বিশ্বকাপ জিততেই এসেছে ব্রাজিল Logo পার্ট-টাইম চাকরি: পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের ৫ জনপ্রিয় উপায় Logo টাকা সঞ্চয়ের টিপস: পকেট খালি হলেও গড়ুন সঞ্চয়ের অভ্যাস

চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা অপূর্ণই রইল, হারাচ্ছে বৈশ্বিক বাজার

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ১০:০৪:১৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
  • ৫৩০

চিত্রঃ পরিবেশগত সংকট ও আন্তর্জাতিক সনদের অভাবে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প।

বাংলাদেশের চামড়া শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। পর্যাপ্ত কাঁচামাল, তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় এবং কয়েক দশকের শিল্পভিত্তি থাকা সত্ত্বেও এই খাত এখনো প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা গেলে তৈরি পোশাক খাতের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে চামড়া শিল্প প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য এবং জুতা রপ্তানি থেকে প্রায় ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার আয় হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অগ্রগতি সম্ভাবনার তুলনায় খুবই সীমিত। বিশ্বব্যাপী চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার কয়েক দশ হাজার কোটি ডলারের। অথচ বাংলাদেশ সেই বাজারের সামান্য অংশও দখল করতে পারেনি। প্রয়োজনীয় সনদ, পরিবেশগত মান এবং আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দেশের রপ্তানি আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে এখনো আন্তর্জাতিক মানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ফলে অধিকাংশ কারখানা আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সনদ অর্জন করতে পারছে না। বিশ্বের বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করতে বিশেষ সনদের ওপর গুরুত্ব দেয়। কিন্তু সেই সনদ না থাকায় বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান সরাসরি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। এর ফলে দেশের উৎপাদকরা কাঙ্ক্ষিত মূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

শিল্প মালিকদের অভিযোগ, বিদেশি ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক কম দামে চামড়া কিনে নিজেদের দেশে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছে। এতে প্রকৃত মুনাফার বড় অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ কেবল কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।পরিবেশ দূষণ কমাতে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে সাভারে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও প্রকল্পটি এখনো পুরোপুরি সফল হয়নি। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদিত বর্জ্যের তুলনায় শোধন সক্ষমতা কম হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে অপরিশোধিত বর্জ্য পরিবেশে মিশে যাচ্ছে। এর ফলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাও কমছে। সরকারি পর্যায়ে সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো স্থায়ী সমাধান দৃশ্যমান হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশের চামড়া শিল্প।

 

প্রতি বছর ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশে বিপুল পরিমাণ পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সংগ্রহকারী, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত মূল্য পাচ্ছে না। অনেক এলাকায় চামড়ার দাম কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে অনেক সময় বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য থাকে না। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন এবং অনেকেই ব্যবসা থেকে সরে যাচ্ছেন।

চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ অপরিহার্য উপাদান। সাম্প্রতিক সময়ে লবণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সংরক্ষণ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একটি বড় চামড়া সংরক্ষণে কয়েক কেজি লবণ প্রয়োজন হওয়ায় ব্যবসায়ীদের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে সরবরাহ সংকট এবং মূল্য অস্থিরতার কারণে তাদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন খরচ ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিকভাবে ব্যবসার ঝুঁকি বাড়ছে।

চামড়া শিল্পের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়ন সংকট। কয়েক বছর আগের তুলনায় ব্যাংক ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন ঋণ প্রদানে আগ্রহ হারিয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন না থাকলে নতুন প্রযুক্তি সংযোজন, কারখানা আধুনিকায়ন কিংবা উৎপাদন সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের চামড়া শিল্প এখনো মূলত স্বল্প প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বেশি মুনাফা আসে জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং অন্যান্য প্রস্তুত পণ্য থেকে। ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং এবং উন্নত মানের প্রস্তুত পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দেশের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। কাঁচামাল রপ্তানির পরিবর্তে প্রস্তুত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যবসায়ীরা একটি স্বতন্ত্র জাতীয় চামড়া বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নীতিগত সমন্বয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ এবং পরিবেশগত সনদ অর্জনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে ট্যানারিগুলোতে পৃথক বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা, কাঁচামাল সংরক্ষণে সহায়তা এবং স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁচামাল, শ্রমশক্তি এবং বৈশ্বিক বাজারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পরিবেশগত মান, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং সঠিক নীতিগত সহায়তার অভাবে দেশের চামড়া শিল্প কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। সাভারের বর্জ্য শোধনাগারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, প্রয়োজনীয় সনদ নিশ্চিত করা, সহজ অর্থায়ন ও রপ্তানি প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং মূল্য সংযোজিত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো গেলে এই খাত নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায় বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের চামড়া শিল্প বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হামে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১০ হাজার ছাড়াল দেশে

চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা অপূর্ণই রইল, হারাচ্ছে বৈশ্বিক বাজার

Update Time : ১০:০৪:১৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬

বাংলাদেশের চামড়া শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। পর্যাপ্ত কাঁচামাল, তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় এবং কয়েক দশকের শিল্পভিত্তি থাকা সত্ত্বেও এই খাত এখনো প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা গেলে তৈরি পোশাক খাতের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে চামড়া শিল্প প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য এবং জুতা রপ্তানি থেকে প্রায় ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার আয় হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অগ্রগতি সম্ভাবনার তুলনায় খুবই সীমিত। বিশ্বব্যাপী চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার কয়েক দশ হাজার কোটি ডলারের। অথচ বাংলাদেশ সেই বাজারের সামান্য অংশও দখল করতে পারেনি। প্রয়োজনীয় সনদ, পরিবেশগত মান এবং আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দেশের রপ্তানি আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে এখনো আন্তর্জাতিক মানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ফলে অধিকাংশ কারখানা আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সনদ অর্জন করতে পারছে না। বিশ্বের বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করতে বিশেষ সনদের ওপর গুরুত্ব দেয়। কিন্তু সেই সনদ না থাকায় বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান সরাসরি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। এর ফলে দেশের উৎপাদকরা কাঙ্ক্ষিত মূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

আরও পড়ুন  কাতারের শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ

শিল্প মালিকদের অভিযোগ, বিদেশি ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক কম দামে চামড়া কিনে নিজেদের দেশে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছে। এতে প্রকৃত মুনাফার বড় অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ কেবল কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।পরিবেশ দূষণ কমাতে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে সাভারে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও প্রকল্পটি এখনো পুরোপুরি সফল হয়নি। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদিত বর্জ্যের তুলনায় শোধন সক্ষমতা কম হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে অপরিশোধিত বর্জ্য পরিবেশে মিশে যাচ্ছে। এর ফলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাও কমছে। সরকারি পর্যায়ে সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো স্থায়ী সমাধান দৃশ্যমান হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশের চামড়া শিল্প।

 

প্রতি বছর ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশে বিপুল পরিমাণ পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সংগ্রহকারী, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত মূল্য পাচ্ছে না। অনেক এলাকায় চামড়ার দাম কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে অনেক সময় বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য থাকে না। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন এবং অনেকেই ব্যবসা থেকে সরে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন  অতিরিক্ত দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি, অভিযানে ধরা পড়লেন ব্যবসায়ী

চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ অপরিহার্য উপাদান। সাম্প্রতিক সময়ে লবণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সংরক্ষণ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একটি বড় চামড়া সংরক্ষণে কয়েক কেজি লবণ প্রয়োজন হওয়ায় ব্যবসায়ীদের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে সরবরাহ সংকট এবং মূল্য অস্থিরতার কারণে তাদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন খরচ ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিকভাবে ব্যবসার ঝুঁকি বাড়ছে।

চামড়া শিল্পের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়ন সংকট। কয়েক বছর আগের তুলনায় ব্যাংক ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন ঋণ প্রদানে আগ্রহ হারিয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন না থাকলে নতুন প্রযুক্তি সংযোজন, কারখানা আধুনিকায়ন কিংবা উৎপাদন সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের চামড়া শিল্প এখনো মূলত স্বল্প প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বেশি মুনাফা আসে জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং অন্যান্য প্রস্তুত পণ্য থেকে। ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং এবং উন্নত মানের প্রস্তুত পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দেশের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। কাঁচামাল রপ্তানির পরিবর্তে প্রস্তুত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন  সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান ও এমডি নিয়োগ

শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যবসায়ীরা একটি স্বতন্ত্র জাতীয় চামড়া বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নীতিগত সমন্বয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ এবং পরিবেশগত সনদ অর্জনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে ট্যানারিগুলোতে পৃথক বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা, কাঁচামাল সংরক্ষণে সহায়তা এবং স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁচামাল, শ্রমশক্তি এবং বৈশ্বিক বাজারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পরিবেশগত মান, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং সঠিক নীতিগত সহায়তার অভাবে দেশের চামড়া শিল্প কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। সাভারের বর্জ্য শোধনাগারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, প্রয়োজনীয় সনদ নিশ্চিত করা, সহজ অর্থায়ন ও রপ্তানি প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং মূল্য সংযোজিত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো গেলে এই খাত নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায় বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের চামড়া শিল্প বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।