আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার সুযোগ রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি দাবি করেন, বাহাত্তরের সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের আদর্শ ও রাজনীতিকে আবারও প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করতে পারে।
রোববার (৩ মে) রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনের সর্বশেষ সেশনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংবিধান সংস্কার এবং সংসদের কার্যক্রম নিয়ে তিনি তীব্র সমালোচনা করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সংসদের প্রথম অধিবেশন দেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে গভীর আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও সরকার তা এড়িয়ে গেছে। বরং নিজেদের ইচ্ছামতো সংসদ পরিচালনা করেছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, “সংসদে আমরা আশা করেছিলাম কীভাবে সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনই একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়াবে।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা থাকলেও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে যাওয়া হয়েছিল। তিনি বিএনপির প্রতিও সমালোচনা করে বলেন, তারা বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে ক্ষমতায় এসে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, শুধুমাত্র সংশোধনের মাধ্যমে টেকসই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তার মতে, বর্তমান সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি সতর্ক করে দেন, যদি বিএনপি সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তনের চেষ্টা করে, তাহলে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং ভবিষ্যতে যেকোনো সময় বাতিল হয়ে যেতে পারে।
নাহিদ ইসলাম সংসদে দেওয়া নিজের বক্তব্যের উল্লেখ করে বলেন, অতীতে জিয়াউর রহমান যে সাংবিধানিক পরিবর্তন করেছিলেন, সেটিকে তিনি একটি ‘ঐতিহাসিক ভুল’ হিসেবে দেখেন। তার দাবি, সেই সিদ্ধান্তের ফলেই আজ বাহাত্তরের সংবিধানের ধারাবাহিকতার যুক্তিতে আওয়ামী লীগের আদর্শ ও রাজনীতিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় একটি সুসংগঠিত ও গ্রহণযোগ্য সাংবিধানিক কাঠামো জরুরি। এজন্য প্রয়োজন ব্যাপক রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
কনভেনশনে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য বক্তারাও দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মানবাধিকার ইস্যু, জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। তারা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য দেশের চলমান রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ধরনের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, সাধারণ জনগণের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। সামনে জাতীয় রাজনীতিতে এই ইস্যুগুলো আরও গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


























