মিয়ানমারে সার পাচার ঠেকাতে কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তে বড় ধরনের যৌথ অভিযান চালিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও উপজেলা কৃষি বিভাগ। অভিযানে পাচারের উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে মজুদ করে রাখা ১৩০ বস্তা সরকারি সার জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে সীমান্তভিত্তিক একটি পাচারচক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বটতলী কবরস্থান মোড় এলাকায় অভিযান চালানো হয়। বিজিবি ও উপজেলা কৃষি বিভাগের সমন্বয়ে পরিচালিত এ অভিযানে স্থানীয় ‘লম্বা কালো’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির দোকানের পাশের একটি বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়।
তল্লাশিতে বিপুল পরিমাণ সরকারি সার মজুদ অবস্থায় পাওয়া যায়। কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে সারগুলো জব্দ করে প্রশাসনের হেফাজতে নেন।
অভিযানে তিনজনের কাছ থেকে মোট ১৩০ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে—
- মুফিজ উদ্দিন (কামাল উদ্দিনের ছেলে) – ৭২ বস্তা
- সাগর (দুদু মিয়ার ছেলে) – ২১ বস্তা
- মোহাম্মদ ইউনুস (নাজির উদ্দিনের ছেলে) – ৩৭ বস্তা
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা উদ্ধার হওয়া সারগুলো সরকারি বিতরণের জন্য নির্ধারিত ছিল কি না, তা যাচাই করছেন।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, সারগুলো সীমান্তবর্তী নাফ নদী দিয়ে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে পাচারের পরিকল্পনা ছিল। উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তের কিছু অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের চোরাচালানের ঝুঁকিতে রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, এই সারও একই রুট ব্যবহার করে সীমান্তের ওপারে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারি ভর্তুকির কারণে বাংলাদেশে সারের দাম তুলনামূলক কম। অন্যদিকে সীমান্তের ওপারে এসব সারের চাহিদা ও মূল্য বেশি হওয়ায় অসাধু চক্রগুলো অবৈধভাবে সার সংগ্রহ করে পাচারের চেষ্টা করে।
অভিযান ও তদন্তে পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনের নাম উঠে এসেছে। তারা হলেন—
- সোনা মিয়া
- ইউনুস
- নুর মোহাম্মদ
- বাদশা মিয়া
- সাগর
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
উখিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিষ সরকার বলেন,
“সরকার কৃষকদের জন্য ভর্তুকি দিয়ে কৃষি উপকরণ সরবরাহ করে। সেই সার অবৈধভাবে মজুদ করা কিংবা সীমান্ত দিয়ে অন্য দেশে পাচার করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এমন ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও জানান, উদ্ধার করা সার বর্তমানে প্রশাসনের নিরাপদ হেফাজতে রয়েছে। তদন্ত শেষে আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজিবি কর্মকর্তারা জানান, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও অবৈধ পণ্য পরিবহন ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য, সার, খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পাচারের বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
তাদের মতে, সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ সরকার কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমাতে প্রতিবছর বিপুল ভর্তুকি দিয়ে রাসায়নিক সার সরবরাহ করে। এসব সার যদি চোরাচালানের মাধ্যমে বিদেশে চলে যায়, তাহলে—
- কৃষকরা প্রয়োজনীয় সময়ে সার সংকটে পড়তে পারেন।
- কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
- সরকারের ভর্তুকির অর্থ অপব্যবহার হয়।
- সীমান্ত এলাকায় সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
- রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ও কৃষি ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সীমান্ত এলাকায় সারের মজুদ ও পরিবহনের ওপর আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় মাঝে মধ্যেই চোরাচালানের চেষ্টা হয়। তারা সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, নিয়মিত অভিযান এবং সরকারি কৃষি উপকরণ বিতরণ ব্যবস্থায় আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
প্রশাসন জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া সারের উৎস, কীভাবে তা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কারা এই পাচারচক্রের অর্থায়ন করেছে—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়া সীমান্ত এলাকায় ভবিষ্যতে যাতে সরকারি সার পাচারের কোনো সুযোগ না থাকে, সে জন্য বিজিবি, কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।
উখিয়া সীমান্তে মিয়ানমারে সার পাচার রোধে পরিচালিত এই অভিযান সীমান্ত নিরাপত্তা ও কৃষি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ১৩০ বস্তা সরকারি সার জব্দ হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষি উপকরণ পাচারে এখনো সক্রিয় কিছু অসাধু চক্র রয়েছে। প্রশাসনের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ আর ঘটতে না পারে।


























