সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তারের এক রোমাঞ্চকর ও ঐতিহাসিক বিবরণ আজ দেশের আপামর জনতা ও আইন প্রণেতাদের সামনে উন্মোচন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে, এই ঘটনা তারই এক অন্যতম বড় ও সফল দৃষ্টান্ত। ইন্টারপোলের রেড নোটিসের ওপর ভিত্তি করে দুবাইয়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই হাই-প্রোফাইল পলাতক আসামিকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। এই সাঞ্চল্যকর খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে আইনি ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আজ রোববার ১৪ জুন দুপুরের দিকে জাতীয় সংসদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্বয়ং স্পিকারের অনুমতি নিয়ে সংসদের টেবিল ও সমগ্র জাতির উদ্দেশ্যে এই দীর্ঘতম আইনি প্রক্রিয়ার রূপরেখা বিশদভাবে তুলে ধরেন। গত কয়েক মাস ধরে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পুলিশিং বিভাগ এই আসামির অবস্থান নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক ও আইনি চ্যানেলে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছিল।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত সাবেক পুলিশ প্রধানকে আইনের আওতায় আনতে ঢাকার পুলিশ হেডকোয়ার্টারস ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোতে (এনসিবি) আবেদন জানিয়েছিল। ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল প্রেরিত সেই জরুরি আবেদনের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল বেনজীরের বিরুদ্ধে একটি রেড নোটিস জারি করে। উক্ত নোটিসের সূত্র ধরেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ১২ জুন এক ইমেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানায় যে তারা বেনজীরকে গ্রেপ্তার করেছে।
জাতীয় সংসদে দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া আনুষ্ঠানিক বক্তব্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রচলিত আইন অনুসারে গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে। কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে এই প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠাতে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই সব ধরণের আইনি দলিলাদি প্রস্তুত করা শুরু করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ইন্টারপোল চ্যানেলের মাধ্যমে দুবাইয়ের স্থানীয় বিদেশি কর্তৃপক্ষের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ এবং ফলোআপ কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বজায় রাখা হচ্ছে।
অতিরিক্ত তথ্য হিসেবে মন্ত্রী জানান, অভিযুক্ত এই সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বর্তমানে বাংলাদেশের আদালতে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট আইনে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্ত সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় দলিলাদি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক্সট্রাডিশন প্রপোজাল দ্রুত অনুমোদন করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এনসিবি আবুধাবির সাথে সরাসরি সমন্বয় করে খুব দ্রুতই তাকে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে নিয়ে আসা সম্পন্ন হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনাকে বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসের একটি অনন্য ও যুগান্তকারী মাইলফলক এবং ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর মাধ্যমে দেশ থেকে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটবে এবং অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—এই বার্তাটি প্রতিষ্ঠিত হবে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে এনে আদালতের মুখোমুখি করার এই চূড়ান্ত প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে সংসদ অধিবেশনে আশা প্রকাশ করা হয়।


























