বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আজ মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পর্তুগাল ও স্পেন। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ডালাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ‘আইবেরিয়ান ডার্বি’ শুধু কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াই নয়, বরং এটি হতে পারে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচও। তাই ম্যাচটি ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে।
এই ম্যাচে একদিকে থাকবেন ৪১ বছর বয়সী কিংবদন্তি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, অন্যদিকে ফুটবল বিশ্বের নতুন সুপারস্টার হিসেবে উঠে আসা ১৮ বছর বয়সী লামিন ইয়ামাল। এক প্রজন্মের বিদায় আর আরেক প্রজন্মের উত্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছে এই মহারণ। ফলে এটি শুধু দুই দলের নয়, দুই যুগেরও লড়াই।
পর্তুগাল ও স্পেনের এই লড়াই গত বছরের উয়েফা নেশনস লিগ ফাইনালের স্মৃতিও ফিরিয়ে আনছে। সেই ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে সমতা থাকার পর টাইব্রেকারে জয় পেয়ে শিরোপা জিতেছিল পর্তুগাল। তবে এবারের বিশ্বকাপে পরিস্থিতি ভিন্ন, কারণ দুই দলই এসেছে ভিন্ন ছন্দ নিয়ে।
গ্রুপ পর্বে পর্তুগালকে প্রত্যাশামতো খেলতে দেখা যায়নি। বেশ কয়েকটি ম্যাচে ছন্দহীন ফুটবল খেলেও শেষ পর্যন্ত নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় রবার্তো মার্তিনেসের দল। এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানো।
অন্যদিকে প্রথম ম্যাচে অপ্রত্যাশিত গোলশূন্য ড্রয়ের পর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে স্পেন। বলের দখল, দ্রুত পাসিং, হাই-প্রেসিং এবং দুর্দান্ত রক্ষণ—সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা দল তারা। গত ১৬ বছরের মধ্যে প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পথে আত্মবিশ্বাসী স্প্যানিশরা।
রোনালদো এখনও পর্তুগাল দলের সবচেয়ে বড় নাম হলেও মাঠে তাঁর প্রভাব আগের মতো নেই। অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দিয়ে দলকে অনুপ্রাণিত করলেও গোল করার ধার আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। তারপরও কোচ রবার্তো মার্তিনেস টুর্নামেন্টজুড়ে তাঁর ওপরই আস্থা রেখেছেন।
অনেকের ধারণা, পর্তুগাল যদি আজ হেরে যায়, তবে সেটিই হতে পারে বিশ্বকাপে রোনালদোর শেষ ম্যাচ। বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে পাঁচটি আসরে খেললেও সেই কাঙ্ক্ষিত ট্রফি এখনও অধরা। তাই এই ম্যাচটি তাঁর জন্য শুধুই একটি নকআউট লড়াই নয়, বরং উত্তরাধিকার রক্ষার লড়াইও।
অন্যদিকে লামিন ইয়ামাল আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তাঁকে ভবিষ্যৎ ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকা বলা হচ্ছে। ইনজুরির শঙ্কা কাটিয়ে বিশ্বকাপে ফিরে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচসেরা পারফরম্যান্স করেছেন তিনি। ইউরো ২০২৪-এর সাফল্যের পর এবার বিশ্বকাপেও স্পেনের অন্যতম ভরসা এই তরুণ উইঙ্গার।
পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচের আগে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে ইয়ামাল বলেছেন, তারা কোনো দলকে ভয় পান না এবং শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছেন। তাঁর এই আত্মবিশ্বাস স্পেনের বর্তমান ফর্মেরই প্রতিফলন। পুরো দলই এখন নিজেদের সেরা ছন্দে রয়েছে।
স্পেনের আক্রমণে এবার সবচেয়ে সফল মিকেল ওইয়ারজাবাল। চার গোল নিয়ে তিনি দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা, আর ইয়ামালও একটি গোল করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকা স্পেন ২০১০ সালের পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে।
মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাসও স্পেনের পক্ষেই কথা বলছে। ১৯২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৪৩ বার দেখা হয়েছে দুই দলের। সেখানে পর্তুগাল জিতেছে মাত্র সাতটি ম্যাচ। যদিও সর্বশেষ বড় আসরের ফাইনালে টাইব্রেকারে জয় তুলে নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছিল পর্তুগিজরা।
স্পেনের শক্তিশালী রক্ষণ ভাঙা হবে পর্তুগালের সবচেয়ে কঠিন কাজ। এবারের বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত কোনো গোল হজম করেনি স্পেন। গোলকিপার উনাই সিমন টানা ৫১৯ মিনিট গোল না খেয়ে বিশ্বকাপের নতুন রেকর্ডও গড়েছেন। তাই রোনালদোদের সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন এক পরীক্ষা।
পর্তুগালের আক্রমণে গনসালো রামোসের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স কোচ মার্তিনেসকে নতুন ভাবনার সুযোগ দিয়েছে। তবে নকআউটের মতো বড় ম্যাচে অভিজ্ঞ রোনালদোকেই শুরুর একাদশে রাখার সম্ভাবনা বেশি। রামোস বেঞ্চ থেকে নেমে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
সবশেষে এই ম্যাচটি হয়তো পরিসংখ্যান বা কৌশলের বাইরে গিয়ে আবেগের এক মহাকাব্যে পরিণত হবে। বিশ্বকাপ ট্রফির অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রোনালদোর সামনে হয়তো এটিই শেষ সুযোগ। আর যদি সত্যিই সেটাই হয়, তবে ‘আইবেরিয়ান ডার্বি’ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে এক কিংবদন্তির শেষ বিশ্বকাপ মহারণ হিসেবে।




























