মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে করা যৌন নিপীড়ন ও মানহানি মামলায় বড় ধরনের আইনি অগ্রগতি হয়েছে। নিউইয়র্কের ফেডারেল বিচারক লুই কাপলান ট্রাম্পের সব আপত্তি খারিজ করে তাঁর জমা রাখা ৫০ লাখের বেশি ডলার অবিলম্বে কলামিস্ট এলিজাবেথ জ্যঁ ক্যারলের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। বুধবার দেওয়া এই আদেশের ফলে ক্ষতিপূরণ পরিশোধ বিলম্বিত করার ট্রাম্পের সর্বশেষ প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে।
মামলাটি প্রায় তিন দশক আগের একটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত। জ্যঁ ক্যারলের অভিযোগ, ১৯৯৬ সালে নিউইয়র্কের একটি বিলাসবহুল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের চেঞ্জিং রুমে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে যৌন নিপীড়ন করেছিলেন। তবে ট্রাম্প শুরু থেকেই অভিযোগটি অস্বীকার করে একে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করে আসছেন।
২০১৯ সালে ক্যারল প্রথমবারের মতো ঘটনাটি প্রকাশ্যে আনেন। এরপর ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাঁকে মিথ্যাবাদী আখ্যা দিলে ক্যারল তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ২০২৩ সালের মে মাসে একটি জুরিবোর্ড ট্রাম্পকে যৌন নিপীড়ন ও মানহানির জন্য দায়ী বলে রায় দেয় এবং ক্যারলকে ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
সেই রায়ের পর থেকেই ট্রাম্প নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ আদালতে আপিল করে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টেও গড়ায়। তবে আপিল প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও ক্ষতিপূরণের অর্থ আটকে রাখার আবেদন আদালত গ্রহণ করেনি।
ট্রাম্পের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্টে পুনর্বিবেচনার আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্থ ক্যারলের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। তাঁদের দাবি ছিল, পরে যদি ট্রাম্প আপিলে জয়ী হন, তাহলে সেই অর্থ ফেরত পাওয়া সম্ভব হবে না।
আইনজীবীরা আরও বলেন, ক্যারল নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি ক্ষতিপূরণের অর্থ বিভিন্ন সংস্থায় দান করবেন। ফলে অর্থ একবার তৃতীয় পক্ষের হাতে চলে গেলে তা আর উদ্ধার করা যাবে না। তাই চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত অর্থ আটকে রাখাই যুক্তিসংগত হবে বলে তাঁরা আদালতের কাছে আবেদন জানান।
তবে বিচারক লুই কাপলান ট্রাম্পের এই যুক্তি গ্রহণ করেননি। তিনি ক্ষতিপূরণের অর্থ আটকে রাখার আবেদন নাকচ করে দেন এবং অবিলম্বে ক্যারলের কাছে অর্থ হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। এর ফলে ট্রাম্পের আইনি কৌশল বড় ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আদালতের এই আদেশের পরপরই ক্যারলের আইনজীবীদের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ট্রাম্পের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা এই আদেশের বিরুদ্ধেও উচ্চ আদালতে আপিল করবেন এবং আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।
ট্রাম্প শিবিরের এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে দাবি করেন, পুরো মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁর ভাষ্য, ডেমোক্র্যাটদের অর্থায়নে ক্যারল একটি বানোয়াট নাটক সাজিয়েছেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ট্রাম্প এসব আইনি লড়াই মোকাবিলা করেই দেশের জন্য কাজ চালিয়ে যাবেন।
এর আগে ট্রাম্পের আইনজীবীরা আদালতে লিখিতভাবে উল্লেখ করেছিলেন, ক্ষতিপূরণের অর্থ আটকে রাখলে ক্যারলের কোনো অপূরণীয় ক্ষতি হবে না। কারণ, বিলম্বের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হবে, তা পরে সুদের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু আদালত সেই যুক্তিকেও গ্রহণ করেনি।
গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের করা আপিল খারিজ করে দেওয়ার পর ক্যারলের আইনজীবীরা নিম্ন আদালতের কাছে জমা রাখা অর্থ ছাড়ের আবেদন করেন। এরপর ট্রাম্পের পক্ষ থেকে দ্রুত পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হলেও সেটিও ক্ষতিপূরণ আটকে রাখতে কাজে আসেনি।
উল্লেখ্য, জ্যঁ ক্যারলের করা এটি ছিল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা। পরে ২০২২ সালে করা দ্বিতীয় মানহানির মামলায় একটি জুরিবোর্ড ট্রাম্পকে আরও ৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেয়। ট্রাম্প জানিয়েছেন, সেই রায়ের বিরুদ্ধেও তিনি চলতি মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবেন।


























