নাঈম তুষারের আত্মহত্যা থেকে ফিরে আসার গল্প শুধু একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত সংগ্রামের কাহিনি নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময় থেকেও নতুন করে বেঁচে ওঠার এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ। ব্যক্তিগত সংকট, পারিবারিক চাপ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা তাঁকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে জীবনের প্রতি সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের এক মোড় তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
তরুণ অভিনেতা ও চিত্রগ্রাহক নাঈম তুষার জানান, একসময় ডিপ্রেশন এতটাই গভীর হয়েছিল যে বারবার আত্মহত্যার চিন্তা তাঁকে তাড়া করত। জীবনের কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ঠিক সেই সময় পরিচালক যুবরাজ শামীমের কাছ থেকে আসে ‘অতল’ সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব। প্রথমে এটি ছিল শুধু একটি চলচ্চিত্রের কাজ, কিন্তু পরে সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর নতুন জীবনের সূচনা।
করোনা মহামারির সময় দুজনই মানসিকভাবে কঠিন সময় পার করছিলেন। পরিচালক যুবরাজ শামীম নিজের ব্যক্তিগত শোক ও হতাশার মধ্যেও এমন একটি গল্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে বাস্তব জীবনের অনুভূতিগুলো ফুটে উঠবে। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ‘অতল’ সিনেমার কাজ। সীমিত বাজেট, একটি স্কুটি আর গাজীপুরের বিভিন্ন লোকেশন ঘুরে শুটিং এগিয়ে চলে। ধীরে ধীরে সৃজনশীল এই কাজের মধ্যেই নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে পান নাঈম।
নাঈমের ভাষায়, সিনেমাটি শুধু একটি প্রজেক্ট ছিল না, বরং তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া একটি অভিজ্ঞতা। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যেন নিজের ভেতরের ভাঙাচোরা মানুষটিকেই নতুন করে চিনতে শেখেন। শিল্পের শক্তি মানুষকে কতটা বদলে দিতে পারে, সেটি তিনি নিজের জীবন দিয়েই উপলব্ধি করেছেন।
তবে এটি ছিল না তাঁর প্রথম বড় লড়াই। প্রায় দুই দশক আগে তিনি দীর্ঘ ছয় বছর মাদকাসক্ত ছিলেন। সেই সময়ও জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। ধীরে ধীরে চিকিৎসা, ইচ্ছাশক্তি এবং পরিবারের সহযোগিতায় তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। পরে সিদ্ধান্ত নেন, নিজের মতো আর কাউকে যেন একই অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যেতে না হয়।
এই লক্ষ্য নিয়েই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আমার হোম’ নামে একটি পুনর্বাসন উদ্যোগ। সেখানে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের কাউন্সেলিং, মানসিক সহায়তা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হয়। অন্যদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারার মধ্যেই তিনি নিজের জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পান।
নাঈম মনে করেন, জীবনে সংকট আসবেই। কিন্তু সেই সংকটই শেষ কথা নয়। প্রতিটি কঠিন সময় মানুষকে নতুন কিছু শেখায়। তাঁর মতে, মানুষ যখন অন্য কারও জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তখনই জীবনের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করা সম্ভব হয়।
বর্তমানে অভিনয়ের চেয়ে ক্যামেরার পেছনের কাজেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। চিত্রগ্রহণই এখন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ক্ষেত্র। পরিচালক যুবরাজ শামীমের নতুন সিনেমা ‘এক ঋতুর অনন্তকাল’-এর চিত্রগ্রহণের কাজ নিয়েও ব্যস্ত সময় পার করছেন।
নাঈম তুষারের এই যাত্রা প্রমাণ করে, হতাশা যত গভীরই হোক, জীবনের সম্ভাবনা কখনো শেষ হয়ে যায় না। একটি সুযোগ, একজন মানুষের বিশ্বাস কিংবা একটি সৃজনশীল কাজও একজন মানুষকে আবার নতুন করে বাঁচতে শেখাতে পারে। তাঁর গল্প তাই শুধু চলচ্চিত্র জগতের নয়, বরং জীবনের কঠিন সময় পার করা অসংখ্য মানুষের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস।




























