মিশরের প্রাচীন খ্রিস্টান শহর আবারও বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। মিশরের পশ্চিমাঞ্চলের দাখলা ওয়েসিসে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় গবেষকরা প্রায় ১,৭০০ বছর আগের একটি সম্পূর্ণ খ্রিস্টান বসতির সন্ধান পেয়েছেন। দীর্ঘদিন মরুভূমির বালুর নিচে চাপা পড়ে থাকা এই শহরে মিলেছে প্রাচীন চার্চ, বসতবাড়ি, দুর্গ, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং শত শত মূল্যবান প্রত্নবস্তু। গবেষকদের মতে, এটি প্রাচীন খ্রিস্টান সভ্যতা সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।
মিশরের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দাখলা ওয়েসিসের আইন আল-সাবিল প্রত্নস্থলে খননের সময় এই আবিষ্কার হয়। প্রত্নতত্ত্ববিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো শহরটি কাঁচা মাটির ইট দিয়ে নির্মিত ছিল। এখানে চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের একটি বিশাল ব্যাসিলিকা চার্চ, শক্তিশালী দুর্গ, দুটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং বড় বড় হলঘরবিশিষ্ট একাধিক বাড়ির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। শহরটির পরিকল্পিত রাস্তা ও স্থাপত্য দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এটি সে সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র ছিল।
সবচেয়ে আলোচিত আবিষ্কারগুলোর একটি হলো চার্চের ডিকন বা ধর্মীয় সহকারী টিসোসের বাড়ি। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, বাড়িটি চতুর্থ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবহৃত হতো। এছাড়া আরেকটি বাড়ির সন্ধান মিলেছে, যেটি সম্ভবত মূল চার্চ নির্মাণের আগেই প্রার্থনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এসব তথ্য থেকে গবেষকরা মনে করছেন, এলাকাটিতে খ্রিস্টধর্মের বিস্তার ধীরে ধীরে ঘটেছিল এবং পরবর্তীতে এটি একটি সুসংগঠিত ধর্মীয় শহরে পরিণত হয়।
খননকাজে শুধু স্থাপনা নয়, বহু মূল্যবান প্রত্নবস্তু উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রান্নার মাটির পাত্র, সুগন্ধি ও তেল সংরক্ষণের বোতল, তেলের প্রদীপ, শস্য পেষার পাথরের যন্ত্র এবং বাইজেন্টাইন সম্রাটদের প্রতিকৃতি খচিত ব্রোঞ্জ ও স্বর্ণমুদ্রা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মুদ্রা সে সময়ের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার হলো প্রায় ২০০টি অস্ট্রাকা বা ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরো, যেখানে কপটিক ও গ্রিক ভাষায় লেখা বিভিন্ন নথি সংরক্ষিত ছিল। এসব লেখায় দৈনন্দিন কেনাবেচা, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র এবং স্থানীয় মানুষের সামাজিক জীবনের নানা তথ্য উঠে এসেছে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এই নথিগুলো শুধু ধর্মীয় ইতিহাস নয়, বরং সেই সময়কার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাচীন শহরটির রাস্তা পরিকল্পিতভাবে উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম দিকে নির্মাণ করা হয়েছিল। বিভিন্ন সড়কের সংযোগস্থলে ছিল খোলা চত্বর এবং শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছিল বিশাল ব্যাসিলিকা চার্চ। এমন পরিকল্পিত নগর কাঠামো থেকে ধারণা করা হচ্ছে, সে সময়ে এই অঞ্চল প্রশাসনিক ও ধর্মীয়ভাবে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মিশরকে প্রাচীন খ্রিস্টধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে একের পর এক প্রাচীন খ্রিস্টান মঠ, গির্জা এবং ধর্মীয় স্থাপনার সন্ধান মিলেছে। চলতি বছরও আপার ইজিপ্ট ও ওয়াদি এল-নাত্রুন এলাকায় একাধিক প্রাচীন খ্রিস্টান স্থাপনা আবিষ্কৃত হয়েছে। নতুন এই শহর সেই ধারাবাহিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে মনে করছেন গবেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মরুভূমির শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে এই শহরের অনেক কাঠামো এবং নিদর্শন তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত খননকাজ চালানো হলে এখান থেকে প্রাচীন খ্রিস্টান সমাজ, ধর্মীয় আচার, অর্থনীতি এবং নগরজীবন সম্পর্কে আরও নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এই আবিষ্কার শুধু মিশরের ইতিহাসকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং বিশ্বের প্রাচীন খ্রিস্টান সভ্যতা নিয়ে গবেষণায়ও নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের আশা, পরবর্তী অনুসন্ধানে এই শহরের আরও অজানা অধ্যায় উন্মোচিত হবে এবং প্রাচীন বিশ্বের ইতিহাস সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যাবে।




























