১৯৫৯ সালের শীতকাল। রাশিয়ার উরাল পর্বতের বরফে ঢাকা দুর্গম এলাকায় শুরু হয়েছিল একদল তরুণ অভিযাত্রীর কঠিন যাত্রা। তারা ছিল অভিজ্ঞ স্কি-পর্বতারোহী, যাদের লক্ষ্য ছিল উত্তর উরালের একটি দুর্গম পথ অতিক্রম করা। কিন্তু সেই অভিযান শেষ হয়েছিল এমন এক রহস্যের মধ্য দিয়ে, যার উত্তর আজও পুরোপুরি মেলেনি।
ডায়াটলভ পাস রহস্য বিশ্বের অন্যতম আলোচিত অমীমাংসিত ঘটনা হিসেবে পরিচিত। কারণ, সেই অভিযানে যাওয়া ৯ জন সদস্যের মৃত্যু হয়েছিল এমন পরিস্থিতিতে, যা অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অভিযাত্রী দলের নেতৃত্বে ছিলেন ইগর ডায়াটলভ। তার নাম থেকেই পরে এই ঘটনার নাম হয় ডায়াটলভ পাস। দলটি ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে যাত্রা শুরু করে। কয়েকদিন পর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবার ও কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন হয়ে তাদের খোঁজ শুরু করে।
অনুসন্ধানকারীরা যখন বরফের মধ্যে তাদের তাঁবু খুঁজে পান, তখন সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয়টি সামনে আসে। তাঁবুটি ভেতর থেকে কাটা ছিল। মনে হচ্ছিল, অভিযাত্রীরা কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বের হয়ে গিয়েছিলেন।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল, প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যেও তারা প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র ছাড়াই বাইরে চলে গিয়েছিলেন বলে তদন্তে জানা যায়। তাপমাত্রা তখন ছিল ভয়ংকরভাবে কম। এমন পরিস্থিতিতে খোলা জায়গায় থাকা প্রায় অসম্ভব ছিল।
পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে তাদের মরদেহ পাওয়া যায়। কারও মৃত্যু হয়েছিল ঠান্ডায় জমে, আবার কিছু মরদেহে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এই বিষয়গুলোই ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
ঘটনার পর বহু বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের তত্ত্ব সামনে আসে। কেউ মনে করেন, তুষারধস বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আবার কেউ মনে করেন, অজানা কোনো ঘটনা বা বাহ্যিক কোনো কারণ এর পেছনে ছিল।
একটি জনপ্রিয় ধারণা হলো, হঠাৎ তুষারধসের আশঙ্কায় অভিযাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে তাঁবু কেটে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তবে অনেক গবেষক মনে করেন, পাওয়া তথ্যের সঙ্গে এই ব্যাখ্যার কিছু অসঙ্গতি রয়েছে।
আরেকটি আলোচিত তত্ত্ব ছিল শক্তিশালী বাতাসের কারণে তৈরি হওয়া বিশেষ ধরনের তুষার পরিস্থিতি। এর ফলে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে এবং দলটি নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
তবে ডায়াটলভ পাস রহস্য নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কেন অভিজ্ঞ অভিযাত্রীরা এত ভয় পেয়ে নিজেদের তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন? কেন তারা পর্যাপ্ত পোশাক নিতে পারেননি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও অনেকের কাছে অজানা।
ঘটনার পর সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ প্রথমদিকে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের কল্পনা ও রহস্য আরও বেড়ে যায়।
সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঘটনা নিয়ে বই, গবেষণা এবং ডকুমেন্টারি তৈরি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রহস্যপ্রেমীরা এখনও এই ঘটনার সত্যতা জানার চেষ্টা করেন।
অনেক বছর পর নতুন তদন্তে বলা হয়, প্রাকৃতিক কারণ এই ঘটনার পেছনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। তাই ডায়াটলভ পাস এখনও বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় ঘটনা হিসেবে মানুষের আগ্রহ ধরে রেখেছে।
বরফে ঢাকা সেই পাহাড়ি পথ আজও মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি কখনো কখনো এমন রহস্য তৈরি করে যার ব্যাখ্যা খুঁজতে মানুষ বছরের পর বছর চেষ্টা করে যায়।
ডায়াটলভ পাস রহস্য শুধু একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়, এটি এমন এক ঘটনা যেখানে ভয়, প্রকৃতি এবং অজানার প্রতি মানুষের কৌতূহল একসঙ্গে মিশে গেছে। ১৯৫৯ সালের সেই রাতের সত্য কী ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক হয়তো আরও বহু বছর চলবে।


























