চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক দুঃসাহসী অধ্যায়। সময়টা ১৯৩০ সাল। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আন্দোলন চলছে। চট্টগ্রামেও তরুণ বিপ্লবীদের একটি দল গোপনে সংগঠিত হচ্ছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন। শিক্ষকতা করা এই মানুষটি ধীরে ধীরে বিপ্লবী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল শুধু একটি অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র নেওয়া নয়, বরং ব্রিটিশ প্রশাসনের যোগাযোগব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে অচল করে চট্টগ্রামে একটি বড় ধরনের বিদ্রোহের সূচনা করা।
১৮ এপ্রিল ১৯৩০। দিনটি ছিল গুড ফ্রাইডে। এই দিনটিকেই বিপ্লবীরা অভিযানের জন্য বেছে নেন। পরিকল্পনা ছিল একাধিক সরকারি স্থাপনায় একই সময়ে অভিযান চালানোর। একদল পুলিশ অস্ত্রাগারে, আরেক দল Auxiliary Force-এর অস্ত্রাগারে অভিযান চালানোর দায়িত্ব পায়। একইসঙ্গে টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস দখল এবং চট্টগ্রামের সঙ্গে অন্য এলাকার রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনাও ছিল। ফলে ঘটনাটি ছিল একটি সমন্বিত অভিযান। রাতের অন্ধকারে বিপ্লবীরা একের পর এক নির্ধারিত স্থানে পৌঁছান। অস্ত্রাগার থেকে কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা গেলেও প্রত্যাশিত পরিমাণ গোলাবারুদ পাওয়া যায়নি। এতে অভিযানের সামরিক দিকটি পুরোপুরি সফল হয়নি, কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে এই আকস্মিক আঘাত ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে।
অভিযানের পর সূর্য সেন ও তাঁর সহযোগীরা চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যান। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। বিপ্লবীদের খুঁজে বের করতে অভিযান শুরু হয়। পরিস্থিতি তখন আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ২২ এপ্রিল ১৯৩০ জালালাবাদ পাহাড় এলাকায় বিপ্লবীদের সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। এই যুদ্ধে বেশ কয়েকজন বিপ্লবী নিহত হন। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ওই সংঘর্ষে ১৪ জন বিপ্লবী শহীদ হন। এরপর বিপ্লবীদের অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন। সূর্য সেনও আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু অস্ত্রাগার অভিযান ব্যর্থ হয়ে গেছে বলেই যে আন্দোলন শেষ হয়ে গেল, তা নয়। বরং এর পরেও চট্টগ্রামজুড়ে বিপ্লবী তৎপরতা চলতে থাকে।
এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বলসহ আরও অনেক তরুণ। পরবর্তী সময়ে কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো নারীরাও এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কল্পনা দত্ত সূর্য সেনের বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বিভিন্ন গোপন কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। আর ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে আক্রমণ পরিচালিত হয়। ঘটনাটি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনকে আরও আলোচিত করে তোলে। প্রীতিলতা গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ধরা পড়ার পরিবর্তে সায়ানাইড গ্রহণ করে আত্মহত্যা করেন। ফলে চট্টগ্রামের আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর নামও স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়।
অন্যদিকে সূর্য সেন দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলার সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেয়। সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কারাগারে তাঁদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। কল্পনা দত্তকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
আজ প্রায় এক শতাব্দী পরও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ইতিহাসের পাতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। কারণ এই ঘটনা শুধু অস্ত্রাগারে অভিযান চালানোর গল্প নয়, এটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে একদল তরুণের সংগঠিত প্রতিরোধের ঘটনা। পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয়নি, কিন্তু এর প্রভাব ছিল গভীর। চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে এবং ব্রিটিশ প্রশাসনও এই আন্দোলনকে গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে বাধ্য হয়। সূর্য সেনের নেতৃত্ব, অনন্ত সিং ও গণেশ ঘোষদের ভূমিকা, জালালাবাদ পাহাড়ের সংঘর্ষ এবং পরে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্তের অংশগ্রহণ মিলে এই অধ্যায়টি চট্টগ্রামের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।



























