ঢাকা ১১:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাটের দাম বাড়ায় খুশি চাষি, বাজারে জমজমাট বেচাকেনা

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৯:৩৩:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫২১

পাটের দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

পাটের দাম ভালো থাকায় স্বস্তিতে রয়েছেন উল্লাপাড়ার কৃষকরা। চলতি মৌসুমের নতুন পাট হাটে উঠতে শুরু করতেই জমে উঠেছে বেচাকেনা। বাজারে দেশি, তোষা, কেনাফ ও মেস্তা পাটের চাহিদা থাকায় গত বছরের তুলনায় এবার ভালো দাম পাচ্ছেন চাষিরা। এতে মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে।

উল্লাপাড়ার পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, কৃষকগঞ্জ ও বোয়ালিয়া পাটের হাটে ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে দেশি পাট প্রতি মণ ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকা, তোষা ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকা এবং কেনাফ ও মেস্তা ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের একই সময়ে এসব পাটের দাম তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ফলে এবার বাজারে ভালো দর পেয়ে কৃষকদের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটেছে।

সদর ইউনিয়নের নাগরৌহা গ্রামের কৃষক সাইদুল ইসলাম এবার তিন বিঘা জমিতে দেশি ও তোষা পাট চাষ করেছেন। সরিষা কাটার পর জমিতে পাট আবাদ করেন তিনি। ফলনও হয়েছে ভালো। ইতোমধ্যে এক বিঘা জমির পাট কেটে জাগ দেওয়া, ধোয়া ও শুকানোর কাজ শেষ করে প্রথম দফায় পাঁচ মণ পাট বাজারে এনেছেন। ভালো দাম পাওয়ায় উৎপাদন খরচ উঠে যাওয়ার পাশাপাশি লাভের আশাও করছেন তিনি।

পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের পূর্ব সাতবাড়িয়া গ্রামের কৃষক খোরশেদ আলমও এবার বাজারদর নিয়ে সন্তুষ্ট। গত বছর পাটের কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় তিনি হতাশ হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতায় এবার চার বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তবে মৌসুমের শুরুতেই দাম ভালো পাওয়ায় তার সেই হতাশা অনেকটাই কেটে গেছে। একইভাবে হাটে পাট নিয়ে আসা বেতবাড়ী, বন্যাকান্দি ও সদাই গ্রামের বেশ কয়েকজন কৃষকও ভালো বাজারদরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, শুধু উল্লাপাড়ার স্থানীয় বাজারেই নয়, দেশের বিভিন্ন মোকামে এবার পাটের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা হাট থেকে পাট কিনে ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, বগুড়া ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মোকামে পাঠাচ্ছেন। চাহিদা বেশি থাকায় তারা তুলনামূলক বেশি দামে পাট কিনছেন। এর সরাসরি সুফল পাচ্ছেন কৃষকরা। বাজারে প্রতিযোগিতা থাকায় ভালো মানের পাটের দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনাও দেখছেন ব্যবসায়ীরা।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এবার উল্লাপাড়ায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে। উপজেলায় ১ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও চাষ হয়েছে ১ হাজার ৬৭১ হেক্টরের বেশি জমিতে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলনও সন্তোষজনক হয়েছে। প্রতি বিঘায় গড়ে সাত থেকে আট মণ পর্যন্ত পাট উৎপাদন হয়েছে। আগাম আবাদ করা পাট এরই মধ্যে বাজারে আসতে শুরু করেছে।

চাষিদের উৎপাদন খরচ কমাতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকেও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ২৫০ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বিনামূল্যে তোষা পাটের বীজ এবং ডিএপি ও এমওপি সার বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে পাট চাষ এবং উন্নত উপায়ে জাগ দেওয়ার বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে পাটের মান ভালো রাখার পাশাপাশি বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়ার সুযোগ বাড়ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমীর মতে, অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষকদের আগ্রহের কারণে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে। উৎপাদনও ভালো হয়েছে। তবে শুধু ভালো ফলন হলেই কৃষকের লাভ নিশ্চিত হয় না; বাজারে ন্যায্য মূল্য পাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই মৌসুমজুড়ে বাজার পরিস্থিতির দিকে কৃষকদের নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

পাটের দাম ভালো থাকায় এবার শুধু কৃষকরাই নন, স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও স্বস্তিতে রয়েছেন। কৃষক ভালো দাম পেলে পরের মৌসুমে পাট চাষে আগ্রহ বাড়তে পারে। এতে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে পাটভিত্তিক ব্যবসা ও বাজার ব্যবস্থাও আরও সক্রিয় হবে। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য হিসেবে পাটের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা তাই কৃষকের জন্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে উল্লাপাড়ার কৃষকদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো, মৌসুমের শেষ পর্যন্ত যেন পাটের দাম ধরে রাখা যায়। শুরুতে ভালো দর পাওয়ার এই ধারা অব্যাহত থাকলে কৃষকের উৎপাদন খরচ, শ্রম ও সময়ের যথাযথ মূল্য পাওয়া সম্ভব হবে। আর তাতে আগামী দিনে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জনপ্রিয় সংবাদ

পাটের দাম বাড়ায় খুশি চাষি, বাজারে জমজমাট বেচাকেনা

Update Time : ০৯:৩৩:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

পাটের দাম ভালো থাকায় স্বস্তিতে রয়েছেন উল্লাপাড়ার কৃষকরা। চলতি মৌসুমের নতুন পাট হাটে উঠতে শুরু করতেই জমে উঠেছে বেচাকেনা। বাজারে দেশি, তোষা, কেনাফ ও মেস্তা পাটের চাহিদা থাকায় গত বছরের তুলনায় এবার ভালো দাম পাচ্ছেন চাষিরা। এতে মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে।

উল্লাপাড়ার পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, কৃষকগঞ্জ ও বোয়ালিয়া পাটের হাটে ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে দেশি পাট প্রতি মণ ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকা, তোষা ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকা এবং কেনাফ ও মেস্তা ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের একই সময়ে এসব পাটের দাম তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ফলে এবার বাজারে ভালো দর পেয়ে কৃষকদের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটেছে।

সদর ইউনিয়নের নাগরৌহা গ্রামের কৃষক সাইদুল ইসলাম এবার তিন বিঘা জমিতে দেশি ও তোষা পাট চাষ করেছেন। সরিষা কাটার পর জমিতে পাট আবাদ করেন তিনি। ফলনও হয়েছে ভালো। ইতোমধ্যে এক বিঘা জমির পাট কেটে জাগ দেওয়া, ধোয়া ও শুকানোর কাজ শেষ করে প্রথম দফায় পাঁচ মণ পাট বাজারে এনেছেন। ভালো দাম পাওয়ায় উৎপাদন খরচ উঠে যাওয়ার পাশাপাশি লাভের আশাও করছেন তিনি।

আরও পড়ুন  আজকের বিনিময় হার: বেড়েছে ডলারের দাম, কমেছে ইউরো ও পাউন্ড

পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের পূর্ব সাতবাড়িয়া গ্রামের কৃষক খোরশেদ আলমও এবার বাজারদর নিয়ে সন্তুষ্ট। গত বছর পাটের কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় তিনি হতাশ হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতায় এবার চার বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তবে মৌসুমের শুরুতেই দাম ভালো পাওয়ায় তার সেই হতাশা অনেকটাই কেটে গেছে। একইভাবে হাটে পাট নিয়ে আসা বেতবাড়ী, বন্যাকান্দি ও সদাই গ্রামের বেশ কয়েকজন কৃষকও ভালো বাজারদরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, শুধু উল্লাপাড়ার স্থানীয় বাজারেই নয়, দেশের বিভিন্ন মোকামে এবার পাটের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা হাট থেকে পাট কিনে ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, বগুড়া ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মোকামে পাঠাচ্ছেন। চাহিদা বেশি থাকায় তারা তুলনামূলক বেশি দামে পাট কিনছেন। এর সরাসরি সুফল পাচ্ছেন কৃষকরা। বাজারে প্রতিযোগিতা থাকায় ভালো মানের পাটের দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনাও দেখছেন ব্যবসায়ীরা।

আরও পড়ুন  ঈদযাত্রায় গাজীপুর মহাসড়কে বাড়ছে যানবাহনের চাপ

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এবার উল্লাপাড়ায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে। উপজেলায় ১ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও চাষ হয়েছে ১ হাজার ৬৭১ হেক্টরের বেশি জমিতে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলনও সন্তোষজনক হয়েছে। প্রতি বিঘায় গড়ে সাত থেকে আট মণ পর্যন্ত পাট উৎপাদন হয়েছে। আগাম আবাদ করা পাট এরই মধ্যে বাজারে আসতে শুরু করেছে।

চাষিদের উৎপাদন খরচ কমাতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকেও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ২৫০ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বিনামূল্যে তোষা পাটের বীজ এবং ডিএপি ও এমওপি সার বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে পাট চাষ এবং উন্নত উপায়ে জাগ দেওয়ার বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে পাটের মান ভালো রাখার পাশাপাশি বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়ার সুযোগ বাড়ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমীর মতে, অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষকদের আগ্রহের কারণে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে। উৎপাদনও ভালো হয়েছে। তবে শুধু ভালো ফলন হলেই কৃষকের লাভ নিশ্চিত হয় না; বাজারে ন্যায্য মূল্য পাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই মৌসুমজুড়ে বাজার পরিস্থিতির দিকে কৃষকদের নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন  বাংলালিংকের নিও পিএসপিকে ই-ওয়ালেটের লাইসেন্স দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

পাটের দাম ভালো থাকায় এবার শুধু কৃষকরাই নন, স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও স্বস্তিতে রয়েছেন। কৃষক ভালো দাম পেলে পরের মৌসুমে পাট চাষে আগ্রহ বাড়তে পারে। এতে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে পাটভিত্তিক ব্যবসা ও বাজার ব্যবস্থাও আরও সক্রিয় হবে। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য হিসেবে পাটের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা তাই কৃষকের জন্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে উল্লাপাড়ার কৃষকদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো, মৌসুমের শেষ পর্যন্ত যেন পাটের দাম ধরে রাখা যায়। শুরুতে ভালো দর পাওয়ার এই ধারা অব্যাহত থাকলে কৃষকের উৎপাদন খরচ, শ্রম ও সময়ের যথাযথ মূল্য পাওয়া সম্ভব হবে। আর তাতে আগামী দিনে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।