ট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য একসময় স্বস্তির নতুন পথ ছিল বাকলিয়া এক্সেস রোড। যানজট এড়িয়ে নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দ্রুত পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করেছিল সড়কটি। চকবাজার, নিউমার্কেট, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যাতায়াত সহজ হওয়ায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই স্বস্তির পথেই এখন তৈরি হয়েছে অস্বস্তি ও আতঙ্ক। অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল, যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের চাপে বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাকলিয়া এক্সেস রোড প্রশস্ত হলেও যানবাহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে সড়কের বিভিন্ন অংশে অটোরিকশার আধিক্য চোখে পড়ে। অনেক চালক গুরুত্বপূর্ণ মোড় কিংবা রাস্তার মাঝামাঝি গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করান। পেছন থেকে দ্রুতগতিতে আসা গাড়িগুলোকে তখন হঠাৎ গতি কমাতে বা পাশ কাটিয়ে যেতে হয়। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নিয়মিত চলাচলকারীরা।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন পথচারী ও শিক্ষার্থীরা। সড়কের আশপাশে বসতি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই পথ ব্যবহার করেন। স্কুল-কলেজে যাওয়া-আসার সময় সড়কে মানুষের চাপ বাড়ে। এর মধ্যে দ্রুতগতির অটোরিকশা হঠাৎ সামনে চলে এলে পথচারীদের আতঙ্কিত হয়ে পড়তে হয়। কোথাও কোথাও রাস্তার পাশে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় পথচারীদের মূল সড়কের কাছ দিয়ে চলাচল করতে হয়, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
অটোরিকশার পাশাপাশি রিকশা, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন একই সময়ে চলাচল করায় সড়কের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো কোনো চালক চলন্ত অবস্থায় যাত্রী ওঠানামা করান। আবার কেউ হঠাৎ ইউটার্ন নেন বা এক লেন থেকে অন্য লেনে চলে যান। এসব আচরণের কারণে পেছনের যানবাহনকে আকস্মিকভাবে ব্রেক করতে হয়। ফলে ছোটখাটো সংঘর্ষ থেকে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সড়কটির এমন পরিস্থিতি কিছুটা পরস্পরবিরোধীও। কারণ যানজট কমানো এবং মানুষের দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করাই ছিল এই পথ তৈরির অন্যতম উদ্দেশ্য। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রকল্প হিসেবে নির্মিত সড়কটি সিরাজউদ্দৌলা রোড থেকে শাহ আমানত সেতু সংযোগ সড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০ ফুট প্রশস্ত এই সড়ক দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প যোগাযোগপথ হিসেবে তৈরি করা হয়।
প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের দিকে। প্রাথমিকভাবে এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০৫ কোটি ৪৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। পরে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িয়ে সংশোধিত ব্যয় প্রায় ২২০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৩ সালে অবকাঠামোগত কাজ শেষ হওয়ার পর সড়কটি চালু হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে নগরের কেন্দ্রীয় অংশে যাতায়াত আরও সহজ হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু বর্তমানে সড়কের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে সড়কের দুই প্রান্তে অটোরিকশার জটলা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ব্যস্ত সময়ে একসঙ্গে ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। যাত্রী পাওয়ার আশায় চালকেরা রাস্তার পাশে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গাড়ি থামিয়ে রাখেন। ফলে চার লেনের সড়ক হলেও কার্যকরভাবে যান চলাচলের জায়গা কমে যায়। এতে যানজট যেমন বাড়ে, তেমনি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
নিয়মিত যাতায়াতকারীদের মতে, অটোরিকশা বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। কারণ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের যাতায়াতে এসব যানবাহনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রয়োজন হলো সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা। নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা করা, রাস্তার মাঝখানে গাড়ি দাঁড় করানো বন্ধ করা এবং চালকদের ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। একই সঙ্গে পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থাও জরুরি।
বাকলিয়া এক্সেস রোডে দুর্ঘটনার নজিরও রয়েছে। ২০২৩ সালের ১৬ আগস্ট সকালে সড়কের মুখে একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। এতে কয়েকজন আহত হন এবং পরে আহতদের একজন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এমন ঘটনার পর সাময়িকভাবে নজরদারি বাড়লেও স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছুদিন পর আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে।
স্থানীয়দের মতে, বাকলিয়া এক্সেস রোড নিরাপদ রাখতে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিয়মিত ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি, যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ, নির্দিষ্ট স্থানে অটোরিকশা ও রিকশার স্টপেজ তৈরি, পথচারী পারাপারে নিরাপদ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা যেতে পারে। পাশাপাশি ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হলে চালকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা বাড়তে পারে।
স্থানীয়দের বক্তব্য, একটি আধুনিক সড়ক নির্মাণের পর শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেটিকে কার্যকর ও নিরাপদ রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগ। বিশেষ করে যে সড়কটি প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত সহজ করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, এক্সেস রোডে আরও ফোর্স বাড়ানো হবে। জনসাধারণের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে জনদুর্ভোগ তৈরি করা যাবে না এবং এ বিষয়ে কঠোর হওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সেই ঘোষণা দ্রুত মাঠপর্যায়ে কার্যকর হবে এবং সড়কে নিয়মিত নজরদারি দেখা যাবে।
দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে নগরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে মানুষের দ্রুত যাতায়াতের জন্য বাকলিয়া এক্সেস রোড নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। প্রায় ২২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই পথ যদি অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচলের কারণে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে এর মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। তাই অটোরিকশা বন্ধ নয়, বরং সুশৃঙ্খল চলাচল নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। স্বস্তির জন্য তৈরি এই সড়ক যেন কোনোভাবেই মানুষের আতঙ্কের কারণ না হয়—এটাই এখন নগরবাসীর প্রত্যাশা।



























