নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা শুরু হয়েছে হাইকোর্টে। ফেনীর বহুল আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর সোমবার (২৪ আগস্ট) রায় দিচ্ছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করছেন।
নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘিরে আদালতপাড়ায়ও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মামলাটিতে নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল ও জেল আপিল করেন। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আইন অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্সের বিষয়টিও হাইকোর্টে আসে। এসব আবেদনের শুনানি শেষে এখন উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত জানানো হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ মামলাটির রায়ের জন্য সোমবার দিন নির্ধারণ করেন। এর আগে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয় ২০ আগস্ট। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর এখন উচ্চ আদালতের রায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
মামলাটির সূত্রপাত ২০১৯ সালে। ওই বছরের ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকায় নেওয়া হলেও কয়েক দিন পর তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বিচার দাবিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সোচ্চার হন।
পরে তদন্ত শেষে নুসরাত হত্যা মামলায় একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলাটির রায় দেন। রায়ে মোট ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ওই রায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলমসহ সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
মামলার রায়ে মাদরাসা শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদরাসাছাত্র নুর উদ্দিনসহ মোট ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। নিম্ন আদালতের এই রায়ের পর আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল ও জেল আপিল করে। একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে।
ডেথ রেফারেন্স হলো নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চ আদালতের অনুমোদনের জন্য পাঠানোর একটি বিচারিক প্রক্রিয়া। তাই নুসরাত হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায় কার্যকর করার আগে হাইকোর্টে এর আইনগত পর্যালোচনা প্রয়োজন হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের পাশাপাশি ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হয়েছে।
২০ আগস্ট শুনানি শেষ হওয়ার পর আদালত রায়ের জন্য ২৪ আগস্ট দিন নির্ধারণ করেন। আজ সেই রায় ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। হাইকোর্টের সিদ্ধান্তে নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে কি না, তা পরিবর্তন হবে কি না অথবা মামলার কোনো আসামির ক্ষেত্রে ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসবে কি না—এসব বিষয় রায়ের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।
নুসরাত হত্যা মামলাটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত মামলাগুলোর একটি। ঘটনার পর দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত, বিচার এবং আসামিদের সাজা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। নিম্ন আদালতের দ্রুত রায়ও তখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল।
এ মামলার হাইকোর্টের রায় শুধু আসামিদের জন্য নয়, নিহত নুসরাতের পরিবার ও মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত মামলাটির পরবর্তী আইনি অবস্থাও নির্ধারণ করবে। রায়ের পর কোনো পক্ষের আইনগত সুযোগ থাকলে তারা প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারবেন।
নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা চলার সময় আদালতের সিদ্ধান্তের প্রতি সবার নজর রয়েছে। বিশেষ করে ২০১৯ সালের নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চ আদালতে কীভাবে পর্যালোচিত হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রায় ঘোষণার পর আদালতের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্তের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।


























