প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে শেষ মুহূর্তেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট দিল্লি সফরের আলোচনা থাকলেও ঢাকা এখনো সফরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি ইস্যুতে অগ্রগতি না হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
দুই দেশের কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে সম্ভাব্য সফর নিয়ে যোগাযোগ করছিলেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সফরের সম্ভাব্য তারিখও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ সরকার বা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো নির্দিষ্ট তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত সফরটি হবে কি না, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।
সফরের ক্ষেত্রে ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে অবস্থান করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে দেশে ফেরাতে এরই মধ্যে নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
এর মধ্যেই ভারতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। ভারত অবশ্য ওই বক্তব্যের সঙ্গে নিজেদের সরকারের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে এবং সফর নিয়ে এখনো বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।
ভারতের অবস্থানও পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে এগোতে হবে। নয়াদিল্লি ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক চায়—তবে দুই দেশের স্বার্থের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে ভারতীয় পক্ষের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিরোধের পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনাও দুই দেশের পুরোনো ইস্যুগুলোর একটি। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, সীমান্ত হত্যা এবং অনিবন্ধিত অভিবাসী ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এসব বিষয়ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতেও বাংলাদেশের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান সরকার ভারতের পাশাপাশি চীন, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
তারেক রহমানের সরকার অবশ্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করার পথে হাঁটতে চাইছে না। বরং বাণিজ্য, যোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বাস্তব স্বার্থের জায়গাগুলোতে দিল্লির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ ধরে রাখতে চায় ঢাকা। ভারতও দুই দেশের সম্পর্ককে ভবিষ্যতমুখী করার কথা বলছে।
তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি এখনো সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ঢাকার কাছে বিষয়টি রাজনৈতিক ও আইনি—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ভারত কীভাবে এ অনুরোধের জবাব দেবে, তার ওপরও দুই দেশের পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সফর পিছিয়ে যাওয়া মানেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি নিশ্চিত হওয়া নয়। বরং নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দুই দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর শেষ পর্যন্ত কবে হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো ঘোষণা নেই। তবে সফরকে ঘিরে বর্তমান টানাপোড়েন স্পষ্ট করছে, সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে শুধু উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নয়—আস্থা, পারস্পরিক স্বার্থ ও দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধানেও অগ্রগতি প্রয়োজন।



























