চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়া সফরের শুরুতে লিটন কুমার দাসকে পাওয়া নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। শেষ পর্যন্ত ফিট হয়ে দলে যোগ দেওয়ায় স্বস্তি ফিরেছিল বাংলাদেশ শিবিরে। কিন্তু দুই টেস্টের সিরিজে সেই লিটনের ব্যাট থেকে এল না একটিও রান। তিন ইনিংসে ২৭ বল খেলে প্রতিবারই শূন্য রানে ফিরেছেন তিনি।
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় দিয়ে সফর শুরু করেছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচেও লিটনের কাছ থেকে বড় কিছু আশা করা হয়েছিল। কিন্তু ১২ বল মোকাবিলা করে মিচেল স্টার্কের বলে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন তিনি। দলের জয় হওয়ায় তাঁর ব্যর্থতা তখন বড় করে সামনে আসেনি।
ম্যাকাইয়ে দ্বিতীয় টেস্টে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। এমন অবস্থায় অভিজ্ঞ লিটনের কাছ থেকে প্রতিরোধ আশা করেছিল দল। কিন্তু মাত্র পাঁচ বল খেলেই স্টার্কের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন তিনি।
দ্বিতীয় ইনিংসেও বদলায়নি চিত্র। ১৪৬ রানে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। লিটন খেলেন ১০ বল, এর মধ্যে প্রথম নয় বল টিকে থাকলেও দশম বলেই তৃতীয় স্লিপে ক্যাচ দেন। এবারও বোলার ছিলেন স্টার্ক।
দুই টেস্টে লিটনের ব্যর্থতার ধরনটিও তাই বেশ দৃষ্টিকটু। তিন ইনিংসেই রানের খাতা খোলার আগেই বিদায় নিয়েছেন তিনি। তিনবারই তাঁর উইকেট নিয়েছেন বাঁহাতি পেসার স্টার্ক—একবার ক্যাচে, একবার এলবিডব্লিউ এবং শেষবার স্লিপে ক্যাচে।
সফরের আগে অবশ্য লিটনকে নিয়ে প্রত্যাশা কম ছিল না। পায়ের চোটের কারণে প্রথম ঘোষিত দলে জায়গা না পেলেও পুনর্বাসন শেষে তাঁকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হয়। কঠিন কন্ডিশনে একজন অভিজ্ঞ ব্যাটারের উপস্থিতি দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে—এমন ভাবনা থেকেই শেষ মুহূর্তে তাঁকে পাওয়া গিয়েছিল।
কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে লিটনের ব্যাটিংয়ের কিছু দুর্বলতা আবারও সামনে এসেছে। সাবেক ক্রিকেটার সারোয়ার ইমরানের মতে, ভালো ব্যাটিং উইকেটে লিটন স্বচ্ছন্দ হলেও কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁর টিকে থাকার প্রবণতা তুলনামূলক কম। কোন বল খেলতে হবে আর কোনটি ছেড়ে দিতে হবে, সেই সিদ্ধান্তই এখানে বড় বিষয়।
অস্ট্রেলিয়ার মতো জায়গায় শুধু শট খেলার দক্ষতা দিয়ে সফল হওয়া কঠিন। বলের গতি ও বাউন্স বুঝে ধৈর্য ধরে ইনিংস গড়তে হয়। কিন্তু লিটনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক স্ট্রোক খেলার প্রবণতা অনেক সময় তাঁকে বিপদে ফেলেছে। বিশেষ করে অফ স্টাম্পের বাইরের বল নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আরেকটি বিষয়ও এই সিরিজে চোখে পড়েছে—বাঁহাতি পেসারের বিপক্ষে লিটনের সমস্যা। রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে স্টার্কের অ্যাঙ্গেল ও গতি সামলাতে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। স্টার্কের সুইংয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় তিন ইনিংসেই তাঁকে একই বোলারের কাছে উইকেট হারাতে হয়েছে।
অথচ অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে লিটনের ফর্ম আশাব্যঞ্জক ছিল। পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্টে সিলেটে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছিল ১২৬ ও ৫৯ রানের ইনিংস। সেই ব্যাটারই অস্ট্রেলিয়ায় এসে তিন ইনিংসে শূন্য করায় হতাশা আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশের জন্য অবশ্য সফরটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে ডারউইনে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের কারণে। কিন্তু লিটনের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে এই সফর হয়ে থাকল হতাশার। কঠিন কন্ডিশনে ব্যাটিং, বল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং বাঁহাতি পেসার সামলানোর জায়গাগুলোতে তাঁকে নতুন করে কাজ করতে হবে।
অভিজ্ঞতার দিক থেকে লিটন বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ব্যাটার। তাই অস্ট্রেলিয়ার এই ব্যর্থতা তাঁর সামর্থ্যের শেষ কথা নয়। বরং কঠিন কন্ডিশনে নিজের ব্যাটিংকে আরও কার্যকর করতে কী পরিবর্তন দরকার, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগ হিসেবেই এই সফরকে দেখা যেতে পারে।



























