মাইক হাসির পরামর্শ নিতে ২৫ মিনিট সময় নিয়ে সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। ম্যাকাই টেস্ট শেষে সংবাদ সম্মেলনে আসতে দেরি হওয়ার পেছনে ছিল এই কথোপকথন। প্যাট কামিন্সের সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পরও নাজমুলের দেখা মিলছিল না। এদিকে দিনের কাজ শেষ করে সংবাদকর্মীদের বাড়ি ফেরার সময় হয়ে আসছিল। ঠিক তখনই ড্রেসিংরুমের সামনে ডাগআউটে নাজমুলকে এক ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলতে দেখা যায়। পরে জানা যায়, সেই ব্যক্তি আর কেউ নন, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক তারকা ক্রিকেটার মাইক হাসি। মাঠে নিয়মিত দেখা হওয়ায় হাসির সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল নাজমুলের।
মাইক হাসির পরামর্শ নেওয়ার ইচ্ছেটা অবশ্য নাজমুলের নিজেরই ছিল। মাঠের খেলা শেষ হওয়ার পর তিনি হাসির কাছে গিয়ে কিছু সময় কথা বলার অনুরোধ করেন। হাসিও রাজি হয়ে যান। প্রায় ২৫ মিনিট তাঁদের মধ্যে কথা হয়। পরে নাজমুল জানান, আলোচনাটি পুরোপুরি তাঁর নিজের ক্রিকেট নিয়ে। কীভাবে আরও ভালো ক্রিকেটার হওয়া যায়, কোথায় উন্নতি করা দরকার এবং নিজের খেলাকে কীভাবে আরও পরিণত করা সম্ভব—এসব বিষয়েই কথা বলেছেন তাঁরা। তবে আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করতে চাননি বাংলাদেশ অধিনায়ক। তাঁর ভাষায়, বিষয়টি ব্যক্তিগত। তাই হাসি তাঁকে ঠিক কী কী পরামর্শ দিয়েছেন, তা জানা যায়নি। তবে একজন প্রিয় ক্রিকেটারের কাছ থেকে সরাসরি পরামর্শ পাওয়ার সুযোগটি যে নাজমুলের জন্য বিশেষ, সেটি তাঁর কথাতেই পরিষ্কার।
ছোটবেলা থেকেই মাইক হাসিকে পছন্দ করেন নাজমুল। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই ব্যাটসম্যানকে নিজের পছন্দের ক্রিকেটারদের তালিকার একেবারে ওপরের দিকে রাখেন তিনি। হাসির ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল তাঁর ধারাবাহিকতা ও পরিপাটি খেলার ধরন। ম্যাচের পরিস্থিতি কিংবা কন্ডিশন বদলে গেলেও নিজের ব্যাটিংয়ের পরিকল্পনা থেকে খুব একটা সরে যেতেন না তিনি। একই সঙ্গে চাপের মুহূর্ত সামলে দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলার ক্ষমতাও ছিল তাঁর অন্যতম শক্তি। এসব গুণই নাজমুলকে ছোটবেলা থেকে টেনেছে। তাই বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজে হাসিকে কাছ থেকে পাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে নিজের খেলা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি নাজমুল।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মাইক হাসির ক্যারিয়ারও ছিল অসাধারণ। ৭৯ টেস্টে ৫১.৫২ গড়ে তাঁর সংগ্রহ ৬ হাজার ২৩৫ রান। টেস্টে সেঞ্চুরি করেছেন ১৯টি। ওয়ানডেতেও ছিলেন সমান কার্যকর। ১৮৫ ম্যাচে ৪৮.১৫ গড়ে করেছেন ৫ হাজার ৪৪২ রান। টি-টোয়েন্টিতে ৩৮ ম্যাচ খেলে তাঁর রান ৭২১। শুধু পরিসংখ্যান নয়, দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক থাকার কারণেও তিনি আলাদা মর্যাদা পেয়েছেন। কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও খেলার প্রতি গভীর বোঝাপড়ার কারণে ক্রিকেট বিশ্বে ‘মি. ক্রিকেট’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন হাসি। এমন একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে নিজের ব্যাটিং নিয়ে সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ যে কোনো তরুণ বা অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের জন্যই মূল্যবান।
এই সিরিজে নাজমুলের জন্য সময়টা অবশ্য পুরোপুরি স্বস্তির ছিল না। ম্যাকাই টেস্টে মাত্র দুই দিনের মধ্যেই বাংলাদেশের ম্যাচ শেষ হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়ার কাছে সেই হার সফরের হতাশাজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। তবে পুরো সিরিজকে শুধু ওই ম্যাচের ফল দিয়ে বিচার করলে বাংলাদেশ দলের ইতিবাচক দিকগুলো আড়ালে পড়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে চার দিনের মধ্যে ৯ উইকেটে হারানো এবং সিরিজ ড্র করা বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। বিশেষ করে পেসারদের পারফরম্যান্স এবং দলের সামগ্রিক লড়াই করার মানসিকতা ছিল নজরকাড়া। সেই কঠিন সফরের মাঝেই নাজমুলের পাওয়া মাইক হাসির সঙ্গে ২৫ মিনিটের আলোচনা তাই তাঁর ব্যক্তিগত ক্রিকেট-শিক্ষার জায়গা থেকে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।
বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজে মাইক হাসি ছাড়াও অস্ট্রেলিয়ার একাধিক সাবেক তারকা ক্রিকেটার ধারাভাষ্য ও বিশ্লেষণের কাজে মাঠে ছিলেন। মার্ক ওয়াহ, রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, জেসন গিলেস্পি, সাইমন ক্যাটিচদের মতো কিংবদন্তিদের কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। কিন্তু নাজমুলের কাছে হাসির জায়গাটা একটু আলাদা। কারণ শৈশবের প্রিয় একজন ক্রিকেটারের কাছ থেকে নিজের খেলা নিয়ে সরাসরি মতামত পাওয়ার সুযোগ সব সময় আসে না। ২৫ মিনিটের সেই কথোপকথনে কী পরামর্শ ছিল, সেটি হয়তো নাজমুল প্রকাশ করবেন না। তবে নিজের ব্যাটিং ও ক্রিকেটকে আরও ভালো করার তাগিদ থেকেই যে তিনি হাসির দ্বারস্থ হয়েছেন, সেটিই এই সাক্ষাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। অস্ট্রেলিয়া সফরের কঠিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাই মাইক হাসির পরামর্শ নাজমুলের জন্য হয়ে থাকল একটি মূল্যবান ক্রিকেটীয় প্রাপ্তি।




























