সততায় পদোন্নতি নিশ্চিত করতে নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ যেন কোনো কর্মকর্তার ক্যারিয়ারে প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়েও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তিনি। রোববার সকালে ঢাকা সেনানিবাসে বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, একজন কর্মকর্তার পেশাগত দক্ষতা, নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা, শৃঙ্খলা, সততা, বিশ্বস্ততা ও দায়িত্ব পালনের যোগ্যতার ভিত্তিতেই পদোন্নতির সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। এতে বাহিনীতে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হবে এবং সদস্যদের মধ্যে আস্থাও বাড়বে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও দেশের প্রতি দায়িত্বের বিষয়টি। তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে। শুধু প্রতিরক্ষা নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা, স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং বিভিন্ন দুর্যোগে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার ক্ষেত্রেও দুই বাহিনীর ভূমিকা রয়েছে। দেশের প্রয়োজনের সময় নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের ত্যাগ ও দায়িত্বশীলতার জন্য প্রধানমন্ত্রী বাহিনীর প্রধানসহ সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানান। তাঁর মতে, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে বাহিনীর সক্ষমতা আরও বাড়বে এবং জাতীয় নিরাপত্তায় তাদের অবদান আরও কার্যকর হবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের স্মরণ করেন। তিনি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদানের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ছাত্র-জননাকে স্মরণ করেন তিনি। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা আহত বা নিহত হয়েছেন, তাঁদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং সশস্ত্র বাহিনীর শহীদ সদস্যদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাহিনীর সদস্যদের আত্মত্যাগের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
নির্বাচনী পর্ষদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থাপনা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসের আকাশপ্রতিরক্ষা পরিচালন কেন্দ্রে স্থাপিত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন বা এডিএসআই পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানে নতুন স্থাপিত এডিএসআইয়ের স্মারক ফলক উন্মোচনের পাশাপাশি এর বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত হন। পরে বিমানবাহিনীর এয়ার কমান্ড অপারেশন সেন্টারে যান প্রধানমন্ত্রী। ডিজিটাল লার্জ ডিসপ্লের মাধ্যমে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান কীভাবে শত্রুবিমানকে বাধা দেয়, সেই কার্যক্রম দেখানো হয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ড্রোনের লাইভ ফিড এবং হেলিকপ্টার থেকে সেনা অবতরণের দৃশ্যও দেখানো হয়। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের আকাশ প্রতিরক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতার চিত্র তুলে ধরা হয়।
এরপর অ্যারোস্পেস রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কমপ্লেক্সে গিয়ে বিমানবাহিনীর গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম দেখেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় তৈরি বিভিন্ন ধরনের আনম্যান্ড এরিয়েল ভেহিকেল বা ড্রোন প্রদর্শন করা হয়। প্রদর্শনীতে কামিকাজি ড্রোন, ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ও ভিটিওএল প্রযুক্তির উড়ন্ত যানও ছিল। প্রধানমন্ত্রী কোয়াডকপ্টারের উড্ডয়ন প্রত্যক্ষ করেন। নিজস্ব গবেষণা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে আধুনিক উড্ডয়নব্যবস্থা তৈরির এই উদ্যোগকে বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর আশা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার এই ধারা ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এর আগে অনুষ্ঠানস্থলে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। এ সময় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, প্রতিরক্ষা সচিবসহ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনী পর্ষদের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব ও পদোন্নতি নির্ধারণে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ তাই অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে সামনে এসেছে। তাঁর এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে বাহিনীতে মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের বিকাশ এবং পেশাদারিত্ব আরও শক্তিশালী হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।


























