নাকে অক্সিজেনের নল, পাশে রাখা অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং স্বজনদের কোলে শুয়ে আছেন ৮০ বছর বয়সী এক মুমূর্ষু বৃদ্ধা। উত্তাল সাগরের বিশাল ঢেউয়ে কখনো ওপরে উঠছে স্পিডবোট, আবার পরক্ষণেই আছড়ে পড়ছে নিচে। এর মধ্যেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বৃদ্ধাকে সাদা পলিথিনে ঢেকে বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তার স্বজনরা। গুরুতর অসুস্থ মাকে ঠিক এভাবেই স্পিডবোটে করে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামের পথে সাগর পাড়ি দিতে হয়েছে জাহাঙ্গীর কবিরকে।
রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে ধারণ করা মর্মান্তিক ওই যাত্রার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। সন্দ্বীপভিত্তিক একাধিক ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিওটি পোস্ট করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভিডিওটি দেখে অনেকেই বৃদ্ধার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করার পাশাপাশি জরুরি মুহূর্তে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নিরাপদে চট্টগ্রামে নেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েও কঠিন প্রশ্ন তুলেছেন।
মুমূর্ষু ওই বৃদ্ধার নাম রওশন আরা বেগম, যিনি সন্দ্বীপ পৌরসভার তালতলি বাজারসংলগ্ন ছটাই বাড়ির বাসিন্দা। তার ছেলে জাহাঙ্গীর জানান, তার মা কয়েক বছর ধরে তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগছেন এবং শনিবার সন্ধ্যা থেকে তার শ্বাসকষ্ট অনেক বেড়ে যায়। রোববার সকালে স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল সন্দ্বীপ মেডিক্যাল সেন্টারে নেওয়া হলে চিকিৎসক তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে দ্রুত চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সকাল ১০টার দিকে মেডিক্যাল সেন্টার থেকে রওশন আরাকে নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন স্বজনেরা এবং বেলা দুইটার দিকে চট্টগ্রামের ওই হাসপাতালে পৌঁছান। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তাকে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন দিতে হয়েছে, তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে স্বাভাবিক নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। রোববার বিকেলে জাহাঙ্গীর জানান, তার মা এখন চট্টগ্রাম শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) ভর্তি আছেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা এখন কিছুটা ভালো হলেও তিনি এখনো পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত নন।
জাহাঙ্গীর অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, জরুরি রোগী পারাপারের জন্য ঘাটে গিয়ে তারা কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের বিশেষ সহায়তা পাননি। শেষ পর্যন্ত উপায় না দেখে কয়েকজন সাধারণ যাত্রীর সঙ্গে জনপ্রতি ৩০০ টাকা ভাড়ায় একটি স্পিডবোটে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হতে বাধ্য হন তারা। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, সাগর উত্তালের পাশাপাশি তখন প্রবল বৃষ্টিও হচ্ছিল। স্পিডবোটে রওশন আরাকে অক্সিজেন দেওয়া হলেও বৃষ্টি থেকে তাকে আড়াল করার তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।
পলিথিন দিয়ে তাকে ঢেকে রাখা হলেও সাগরের প্রবল বাতাসে তা বারবার সরে গিয়ে তিনি বৃষ্টিতে ভিজে যান। জাহাঙ্গীর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘এমন দুর্ভাগ্য আমাদের যে জরুরি চিকিৎসায় রোগী পারাপারের কোনো সুব্যবস্থা নেই। উল্টো নিজেদের জীবনের শঙ্কা নিয়েই মুমূর্ষু রোগী নিয়ে সাগরে ঝাঁপ দিতে হয়।’ এদিকে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ বশির আহম্মেদ জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে চট্টগ্রামসহ দেশের চার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে এবং ১ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত এই সতর্কসংকেত বহাল থাকবে বলে এ সময় সাগর বেশ উত্তাল থাকে।
সন্দ্বীপে জরুরি রোগী পারাপারের জন্য দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স সরকারিভাবে বরাদ্দ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে সেগুলো সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে আছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একটি সি-অ্যাম্বুলেন্স ২০০৮ সাল থেকে গুপ্তছড়া ঘাটের কাছে কেওড়াবাগানে স্থলভাগে পড়ে আছে, যা এক দিনের জন্যও রোগী পরিবহনে ব্যবহার করা হয়নি। এরপর ২০১৫ সালে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের পক্ষ থেকে আরও একটি সি-অ্যাম্বুলেন্স সন্দ্বীপে দেওয়া হলেও সেটিও একবারের জন্যও চলাচল করেনি বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।
বর্তমানে সেই দ্বিতীয় অ্যাম্বুলেন্সটিও হারামিয়া ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অবহেলায় পড়ে আছে। মুমূর্ষু রোগী পারাপারে সি-অ্যাম্বুলেন্স কেন ব্যবহার করা হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মানস বিশ্বাস বলেন, ‘ওই দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স অচল হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। আমরা নতুন সি-অ্যাম্বুলেন্সের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন জানিয়েও এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের ইতিবাচক সাড়া পাইনি।’




























