শিশুর চিনি খাওয়া দুই বছর বয়সের আগে সীমিত রাখলে ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো থাকতে পারে এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমতে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। যদিও গবেষকরা বলছেন, এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা এবং এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষণাটি যুক্তরাজ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের খাদ্য রেশনিং ব্যবস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে করা হয়েছে। সে সময় চিনি রেশনিং চালু থাকায় ছোট শিশুদের খাদ্যতালিকায় তুলনামূলকভাবে কম চিনি ছিল। ১৯৫৩ সালে চিনি রেশনিং শেষ হওয়ার পর মানুষের দৈনিক চিনি গ্রহণের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
গবেষকরা যুক্তরাজ্যের UK Biobank-এ অংশ নেওয়া প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ করেন। তারা দেখেছেন, যেসব ব্যক্তি দুই বছর বয়স পর্যন্ত কম চিনিযুক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন, তাদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৩ শতাংশ কম ছিল। শুধু তাই নয়, তাদের ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়া গড়ে আড়াই বছর পরে শনাক্ত হয়েছে।
গবেষণার প্রধান গবেষক জিয়াঝেন ঝেং বলেন, শিশুর চিনি খাওয়া জীবনের একেবারে শুরুতে সীমিত রাখা হলে দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, এই সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি সরাসরি প্রমাণ করে না যে কম চিনি খেলেই ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব। কারণ গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা বাস্তবে কতটা চিনি খেয়েছিলেন, তা জানা যায়নি। তাদের জন্মকাল এবং সেই সময়ের খাদ্য রেশনিংয়ের তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
স্বাধীন গবেষণা সংস্থা Cochrane-এর গবেষক র্যাচেল রিচার্ডসন বলেন, ফলাফল আগ্রহের সৃষ্টি করলেও এটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। তার মতে, ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকের শিশুদের খাদ্যাভ্যাস বর্তমান সময়ের শিশুদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন ছিল। তাই আজকের শিশুদের ক্ষেত্রে একই ফল প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
অ্যাস্টন ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল ফার্মেসির অধ্যাপক ইয়ান মেইডমেন্টও একই মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, প্রায় ৮০ বছর আগের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে বর্তমান সময়ের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা কঠিন। কারণ এই দীর্ঘ সময়ে জীবনযাপন, চিকিৎসা, পরিবেশ ও অন্যান্য অসংখ্য বিষয়ও মানুষের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে Alzheimer’s Research UK-এর গবেষক ড. সারা রদ্রিগেজ মনে করিয়ে দিয়েছেন, এটি একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। তাই এটি কেবল সম্ভাব্য সম্পর্ক দেখাতে পারে, কিন্তু কম চিনি খাওয়াই ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
তবে বিশেষজ্ঞদের সবার একটি বিষয়ে একমত দেখা গেছে। সেটি হলো, শিশুর চিনি খাওয়া নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ছোটবেলা থেকেই সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা ভবিষ্যতের সুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস শুধু শিশুদের শারীরিক বিকাশেই নয়, দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, ডিমেনশিয়ার মতো জটিল রোগের পেছনে অনেক কারণ কাজ করে। তাই শুধুমাত্র চিনি নয়, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক সক্রিয়তা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস—সবকিছু মিলিয়েই ভবিষ্যতে সুস্থ মস্তিষ্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে।


























