মেসির অবসর যেন ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক যুগের সমাপ্তির বার্তা। ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি। ৩১ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আবেগঘন বার্তায় তিনি জানান, জাতীয় দলের হয়ে আর তাঁর কিছু দেওয়ার নেই। তবে এর অর্থ এখনই ফুটবলকে পুরোপুরি বিদায় জানানো নয়। ক্লাব ফুটবলে ইন্টার মায়ামির হয়ে এখনও খেলবেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
মেসির এই সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বয়স, শারীরিক চাপ এবং দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর একটি অধ্যায় শেষ করার প্রয়োজন। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেকের পর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের জার্সি পরেছেন তিনি। এই সময়ে অসংখ্য ম্যাচ, দীর্ঘ ভ্রমণ, অনুশীলন এবং বড় টুর্নামেন্টের চাপ সামলাতে হয়েছে তাঁকে। মেসির নিজের ভাষাতেও সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না; বরং তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছে।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ অধ্যায়টিও ছিল আবেগে ভরা। ২০২৬ বিশ্বকাপে দলকে ফাইনালে তুললেও স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয় আর্জেন্টিনার। এরপরই মেসি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন। তাঁর প্রকাশিত বার্তা অনুযায়ী, ফাইনালের মাত্র দুই দিন পরই অবসর নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন তিনি। পরে বাবার মৃত্যুর ঘটনাও তাঁর সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ় করে।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির পরিসংখ্যানও তাঁর অসাধারণ ক্যারিয়ারের সাক্ষ্য দেয়। ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় হিসেবে বিদায় নিচ্ছেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জেতে। ২০২২ সালে ফিনালিসিমাও জিতেছিল দলটি। অর্থাৎ যে মেসি একসময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় শিরোপা জিততে না পারার সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার অন্যতম সফল অধিনায়ক হয়ে বিদায় নিলেন।
তবে মেসির অবসর মানে এখনই তাঁর বুটজোড়া তুলে রাখা নয়। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে মেসির চুক্তি ২০২৮ MLS মৌসুমের শেষ পর্যন্ত রয়েছে। ক্লাবটির পক্ষ থেকেও চুক্তি বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক বিরতিতে আর আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে না হলেও ক্লাব ফুটবলে তাঁকে আরও কয়েক বছর দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর ফলে মেসির ওপর ম্যাচ ও ভ্রমণের চাপও কমবে। জাতীয় দলের খেলা মানে নিয়মিত দীর্ঘ ভ্রমণ, অনুশীলন ও প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে অংশ নেওয়া। এখন সেই ব্যস্ততার একটি বড় অংশ থেকে মুক্ত থেকে ইন্টার মায়ামির ম্যাচ ও নিজের শারীরিক প্রস্তুতিতে বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন তিনি। তবে ৩৯ বছর বয়সে এসে তাঁর ক্লাব ক্যারিয়ারও যে শেষের দিকে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
মেসির সিদ্ধান্তে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি হয়তো নিজের জায়গা নতুন প্রজন্মের জন্য ছেড়ে দিতে চাইছেন। তাঁর বিদায়ী বার্তায় তরুণ খেলোয়াড়দের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সামনে এমন অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার রয়েছে যারা জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পাওয়ার যোগ্য। অর্থাৎ এটি শুধু নিজের ক্যারিয়ারের সমাপ্তি নয়, আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রজন্মকে জায়গা করে দেওয়ার সিদ্ধান্তও।
মেসি এর আগে ২০১৬ সালেও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেবার কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। তবে পরে ফিরে এসে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সাফল্যময় অধ্যায়গুলোর অন্যতম নির্মাণ করেন। এবারও কি একইভাবে ফিরে আসবেন? আপাতত সেই সম্ভাবনার কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং এবার তাঁর সিদ্ধান্ত অনেক বেশি পরিণত ও চূড়ান্ত বলেই মনে হচ্ছে।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির গল্প তাই শেষ হচ্ছে দুঃখের চেয়ে গর্বের জায়গায়। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপে যাত্রা শুরু করা সেই তরুণ ফুটবলার শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হয়েছেন। ব্যর্থতার হতাশা পেরিয়ে তিনি পেয়েছেন কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ ও অসংখ্য ব্যক্তিগত স্বীকৃতি। এখন তাঁর সামনে রয়েছে ক্যারিয়ারের শেষ ক্লাব অধ্যায়।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসিকে আর মাঠে দেখা যাবে না—এই বাস্তবতা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য নিঃসন্দেহে কঠিন। কিন্তু ইন্টার মায়ামির জার্সিতে তাঁর জাদু দেখার দরজা এখনও খোলা। জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হলেও মেসির ফুটবল গল্পের শেষ পৃষ্ঠা এখনও লেখা হয়নি।


























