ইমরান খানকে ঘিরে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে এবার সরব হয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটার ও ক্রিকেট সংগঠক সৈয়দ আশরাফুল হক। দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকা পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের স্বাস্থ্যের অবনতি এবং তাঁর চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আশরাফুল হক বলেছেন, ইমরানের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে, তা ‘বর্বরতার শামিল’। তাঁর মতে, একজন বিশ্বজুড়ে সম্মানিত ব্যক্তিকে এমন পরিস্থিতিতে রাখা কোনো সভ্য সমাজের জন্য কাম্য নয়। ইমরানের যথাযথ চিকিৎসা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ইমরানের প্রতি এই সমর্থনের পেছনে অবশ্য শুধু ক্রিকেটীয় সম্পর্ক নেই। আশরাফুল হকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোর অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ঢাকায় খেলতে এসেছিলেন তরুণ ইমরান। সেই সফরেই দুজনের পরিচয় ও বন্ধুত্ব। আশরাফুলের স্মৃতিতে তখনকার ইমরান ছিলেন প্রতিভাবান এক তরুণ, যিনি জোরে বল করার পাশাপাশি ব্যাট হাতেও নজর কেড়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে ক্রিকেট মাঠের সেই পরিচয় গভীর বন্ধুত্বে রূপ নেয়। পরে ইংল্যান্ডে পড়াশোনার সময়ও তাঁদের দেখা হয়েছে, আবার পাকিস্তান দলের ভারত সফরসহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ ছিল দুজনের।
ক্রিকেট থেকে রাজনীতিতে যাওয়ার পরও সেই সম্পর্ক থেমে যায়নি। বরং ইমরানের রাজনৈতিক ভাবনা নিয়েও তাঁদের মধ্যে আলোচনা হতো বলে জানিয়েছেন আশরাফুল। তাঁর বর্ণনায়, ইমরান ছিলেন নিজের বিশ্বাস ও আদর্শ নিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় একজন মানুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও নিজের নীতি থেকে সরে না যাওয়ার মানসিকতার কথা ইমরান তাঁকে বলেছিলেন। আশরাফুলের বিবৃতিতে উঠে এসেছে সেই কথোপকথনের স্মৃতিও। তাঁর চোখে, রাজনীতিতে আসার পর ইমরান সাধারণ জীবনযাপনের সুযোগ পেয়েও নিজের বিশ্বাস ও দেশের জন্য কাজ করার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়েও ইমরানের অবস্থানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন আশরাফুল হক। তাঁর দাবি, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের করা অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো পাকিস্তানের প্রথম রাজনৈতিক নেতাদের একজন ছিলেন ইমরান। এ কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের একটি আলাদা মাত্রা রয়েছে বলেও মনে করেন আশরাফুল। তিনি ইমরানের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিজের পরিচয়ের কথাও স্মরণ করেছেন। নব্বইয়ের দশকে ঢাকার বুড়িগঙ্গায় তাঁদের একসঙ্গে নৌভ্রমণের স্মৃতিও বিবৃতিতে উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে ইমরানকে শুধু একজন সাবেক ক্রিকেটার বা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, দীর্ঘদিনের বন্ধু হিসেবেই দেখেন আশরাফুল।
এদিকে ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পর তাঁর চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টও তাঁর যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিভিন্ন দেশের ২১ জন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়ক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে চিঠি দিয়েছেন। ক্রিকেট বিশ্বের পরিচিত ব্যক্তিদের এমন উদ্যোগের মধ্যেই ইমরানের পাশে দাঁড়ালেন বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটাররাও। এর আগে সাবেক বাংলাদেশ অধিনায়ক খালেদ মাসুদও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইমরানের নেতৃত্ব, সাহস ও ক্রিকেটীয় অবদানের প্রশংসা করে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ইমরান খানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আশরাফুলের এই বক্তব্য তাই শুধু দুই সাবেক ক্রিকেটারের বন্ধুত্বের গল্প নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবিকতা, ক্রিকেট এবং দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক। ক্রিকেট মাঠে যাঁর নেতৃত্বে পাকিস্তান বিশ্বকাপ জিতেছিল, সেই ইমরান আজ রাজনৈতিক জীবনের কঠিন অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আর দূর বাংলাদেশ থেকে তাঁর পুরোনো বন্ধু আশরাফুল হক সেই পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যে মূল বার্তা একটাই—রাজনীতি বা মতাদর্শের বাইরে একজন মানুষের চিকিৎসা, মর্যাদা ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
























