পোলাওর চালের দাম নিয়ে নতুন করে চাপে পড়েছেন ক্রেতারা। ঘরোয়া আয়োজন থেকে শুরু করে বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা রেস্টুরেন্ট—সব জায়গাতেই ব্যবহৃত এই চাল এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ভালো মানের প্যাকেটজাত পোলাওর চাল ২১০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি এবং খোলা চাল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ছয় মাসের ব্যবধানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে সাধারণ ক্রেতার পাশাপাশি রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদেরও বাড়তি খরচ সামলাতে হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই দাম বাড়ার পেছনে আসল কারণ কী?
পোলাওর চালের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে একাধিক কারণ সামনে এসেছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ বলছে, সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন বাড়ার পর দেশীয় বাজারে সরবরাহ কমেছে। অন্যদিকে কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, বড় মিল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ধান-চাল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। ফলে বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য থাকার পরও দাম বাড়ছে। তবে রপ্তানিকারকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, দেশে সুগন্ধি চালের উৎপাদন অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট বেশি। তাই সীমিত পরিমাণ রপ্তানির কারণে এত বড় মূল্যবৃদ্ধি হওয়ার কথা নয়। এই ভিন্নমতের কারণে বাজারে দাম বাড়ার প্রকৃত কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে আলোচনা।
সাম্প্রতিক বাজারদর দেখলেও মূল্যবৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। এক মাস আগে যেখানে কোনো কোনো প্যাকেটজাত পোলাওর চাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজিতে পাওয়া গেছে, এখন সেখানে একই ধরনের চাল বিক্রি হচ্ছে ২১০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত। খোলা চালের দামও বেড়েছে। পাইকারি বাজারে ভালো মানের চিনিগুঁড়া চালের ৫০ কেজির বস্তা এক মাস আগে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ টাকা ছিল। বর্তমানে সেটি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ২ হাজার টাকা। পোলাওর চালের দাম এভাবে বাড়ায় সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুগন্ধি চালের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।
চিনিগুঁড়া বা ব্রি-৩৪ জাতের ধান থেকে সাধারণত পোলাওর চাল উৎপাদন করা হয়। দিনাজপুরসহ দেশের কয়েকটি অঞ্চলে এই ধানের উল্লেখযোগ্য উৎপাদন রয়েছে। চলতি মৌসুমে দিনাজপুরে চিনিগুঁড়া ধানের চাষও আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। ফলে শুধু উৎপাদন কমে যাওয়াকে দাম বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। রপ্তানির অনুমোদন নিয়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৫ হাজার ৩২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আগের অর্থবছরে অনুমোদনের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৯৫৯ টন। অর্থাৎ অনুমোদিত রপ্তানির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
তবে রপ্তানিকারকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অনুমোদনের পরিমাণ বাড়লেও বাস্তবে রপ্তানি হওয়া চালের পরিমাণ দেশের মোট উৎপাদনের তুলনায় খুব বেশি নয়। তাদের হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয় এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। অর্থাৎ কয়েক লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। তাদের যুক্তি, এই উদ্বৃত্তের সামান্য অংশ বিদেশে গেলে দেশের বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়। অন্যদিকে বাজারসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, উৎপাদনের মৌসুমে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ ধান কিনে রাখার কারণে পরবর্তী সময়ে বাজারে সরবরাহের ওপর প্রভাব পড়ছে। ফলে পোলাওর চালের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রপ্তানি ও মজুত—দুই বিষয়ই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোক্তাদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাজারে প্রকৃত সংকট আছে কি না এবং থাকলে এর কারণ কী। যদি উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকে, তাহলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান জরুরি। আবার রপ্তানির কারণে সরবরাহে চাপ তৈরি হলে তার প্রভাবও বাজারে বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে বড় মিল বা ব্যবসায়ীদের মজুতের অভিযোগ সত্য কি না, সেটিও নজরদারির আওতায় আসা প্রয়োজন। কারণ পোলাওর চাল শুধু উৎসবের খাবার নয়, বহু পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মিত প্রয়োজনের অংশ। বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত হলে ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপও কমতে পারে। তাই পোলাওর চালের দাম কোন পর্যায়ে গিয়ে স্থির হয়, এখন সেদিকেই নজর সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের।




























