খেলাপি ঋণ এখন আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় এবং উদ্বেগজনক সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ব্যাংকিং খাতের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার পেছনে এটি অন্যতম প্রধান কারণ। বারবার সুবিধা দেওয়া সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ব্যাংকের টাকা ফেরত আসছে না, যা সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং আমানতকারীদের মনে গভীর দুশ্চিন্তার জন্ম দিচ্ছে।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১ হাজার কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণগ্রহীতাদের জন্য ১৫ বছর পর্যন্ত পরিশোধের বিশেষ সুযোগ ঘোষণা করেছে। অর্থনৈতিক সংকট, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধিকে এ সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এতে বড় ঋণখেলাপিরা অতিরিক্ত সুবিধা পেলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুয়ায়ী, বর্তমানে দেশের খেলাপি ঋণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছুঁয়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩২.৭৮ শতাংশই এখন খেলাপি বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এতে দেখা যায়, ব্যাংক থেকে দেওয়া প্রতি তিন টাকার এক টাকাই এখন আটকে আছে।
অতীতের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঋণ পুনঃ তফশিল করে নিয়মিত দেখানোর চেষ্টা করা হলেও কয়েক বছর পর সিংহভাগ টাকাই আবার খেলাপিতে পরিণত হয়। ২০২৪ সাল শেষে তফশিল করা ঋণের প্রায় ৩৮ শতাংশই পুনরায় খেলাপিতে রূপ নিয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, কেবল পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দিলে আদায়ের হার বাড়ে না।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কায় খেলাপিদের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত পালন বাধ্যতামূলক করা হয়ে থাকে। ভারতে মোট খেলাপির হার মাত্র ১.৮ শতাংশ, যা কঠোর আইনি কাঠামোর সুফল প্রমাণ করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে বারবার নতুন ছাড়ের ফলে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অনেকে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সময় বাড়ানো কিংবা কাগজে ঋণ নিয়মিত দেখালেই এই সংকটের সমাধান মিলবে না। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য স্বচ্ছ পুনর্গঠন নীতি চালু করা জরুরি। তদারকি জোরদার না করলে ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফেরানো এবং অর্থনৈতিক গতি বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।


























