ইরানে ইউনিসেফের সমালোচনা ঘিরে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের শিশু অধিকারবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নির্বাহী বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তেহরান সরাসরি এই বহুজাতিক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ইরানের জাতিসংঘ প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি অভিযোগ করেন যে, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় শত শত নিরীহ শিশুর মৃত্যু ও হতাহতের ঘটনায় সংস্থাটি রহস্যজনকভাবে নীরবতা বজায় রাখছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনা জানিয়েছে, নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করে শিশুহত্যার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নেওয়াতেই এই সমালোচনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন সংবাদের জন্ম দিয়েছে।
জাতিসংঘের মূল নীতি অনুযায়ী সকল নাগরিক ও বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা জরুরি হলেও মাঠপর্যায়ে আন্তর্জাতিক সংস্থার নীরব ভূমিকা ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। ইরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে ইউনিসেফ তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিনিধির সঙ্গে এই স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে ইরাভানির চরম বাদানুবাদ বৈঠকটিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইউনিসেফ অবশ্য ইতোপূর্বে সংঘাতের সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে সরাসরি দায়ী না করে তারা কেবল বেসামরিক শিশু হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বার্তা দিয়ে থাকে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতের প্রথম পাঁচ মাসেই ইরানে অন্তত ৩৮৬ শিশু নিহত এবং ২ হাজার ১১৭ শিশু আহত হওয়ার মতো হৃদয়বিদারক তথ্য পাওয়া গেছে। ইরানে ইউনিসেফের সমালোচনা জোরালো হওয়ার পেছনে পরিসংখ্যানগত এই ভয়াবহ চিত্র অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে বিগত মার্চ মাসে দেশটির মিনাব এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ হামলায় ১৬৮ জন নিরীহ মেয়েশিশু নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছিল। সেই মর্মান্তিক ঘটনার পরও সরাসরি দায়ী পক্ষকে অভিযুক্ত না করায় ইরানে ইউনিসেফের সমালোচনা আরও তীব্র ও কঠোর রূপ নেয়। এরপর সম্প্রতি দক্ষিণ ইরানের উপকূলীয় কুহেস্তাক এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় পাঁচজন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের মতে, আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকটি শিশু গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।
একই সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের আহভাজ ও আগাজারি এলাকায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আরও সাতজন বেসামরিক লোক নিহত এবং আটজন আহত হন। ফলে যুদ্ধের ভয়াবহতা অব্যাহত থাকায় ও হতাহতের সংখ্যা প্রতিদিন বৃদ্ধি পাওয়ায় ইরানে ইউনিসেফের সমালোচনা আন্তর্জাতিক নীতি ও মানবাধিকার রক্ষায় নতুন প্রশ্ন তুলে ধরেছে। একের পর এক বিমান ও রকেট হামলায় নিরপরাধ শিশু ও পরিবারগুলো চরম মানবেতর সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
সর্বশেষ এই হামলায় বিপুল পরিমাণ বেসামরিক ক্ষতির পর জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবিলম্বে কার্যকর ভূমিকা পালনের দাবি সর্বস্তরে উঠেছে। যুদ্ধ বা সংঘাতময় পরিস্থিতিতে শিশুরা যাতে কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক কৌশলের শিকার না হয়, সে বিষয়টি সুনিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। ফলে ইরানে ইউনিসেফের সমালোচনা জাতিসংঘের ওপর কেবল মনস্তাত্ত্বিক চাপই বাড়ায়নি, বরং বিশ্বজুড়ে শিশুদের অধিকার ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্ববাসীকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।


























