শিক্ষার্থীরা লেখালেখির কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হলে তাদের চিন্তা, পরিকল্পনা ও লেখার দক্ষতায় প্রভাব পড়তে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, নিজের চিন্তা থেকে লেখা শুধু একটি লেখা তৈরির কাজ নয়, বরং এটি শেখা ও চিন্তা করার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। এআই যদি ভাবনা তৈরি, খসড়া লেখা ও সম্পাদনার পুরো কাজ করে দেয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা লেখার মাধ্যমে যে দক্ষতাগুলো অর্জন করে, সেগুলোর কিছু হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী রোনাল্ড টি কেলগ দীর্ঘদিন ধরে মানুষের লেখার ধরন নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, একটি সাধারণ যুক্তিনির্ভর রচনাও লেখা বেশ কঠিন মানসিক কাজ। ভালোভাবে লিখতে শব্দভাণ্ডার, বানান ও ব্যাকরণের ওপর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিষয়টি বুঝতে হয়। এরপর প্রয়োজনীয় তথ্য বেছে নিয়ে সেগুলো পরিকল্পনা করে সাজাতে হয়।লেখার সময় মস্তিষ্ককে একসঙ্গে অনেক ধরনের কাজ করতে হয়। নিজের চিন্তা গুছিয়ে নেওয়া, যুক্তি তৈরি করা এবং সেগুলো পরিষ্কার ভাষায় প্রকাশ করার চেষ্টা করতে হয়। পাশাপাশি লেখার ভুল খুঁজে সংশোধন করতে হয়। এসব কারণে লেখালেখি মানুষের চিন্তা ও শেখার দক্ষতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
বর্তমানে উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআই ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনায় এআই ব্যবহার করছে। তাদের একটি বড় অংশ রচনা, অ্যাসাইনমেন্ট ও অন্যান্য লেখার কাজেও চ্যাটবটের সাহায্য নিচ্ছে।
অনেক শিক্ষক চান, শিক্ষার্থীরা অন্তত কিছু লেখার কাজ নিজেরা করুক। এ কারণে কোথাও হাতে লেখা, ব্লু বুক কিংবা শ্রেণিকক্ষে তত্ত্বাবধানে রচনা লেখার মতো পদ্ধতিতে আবার গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতের নেতারা বলছেন, কর্মক্ষেত্রেও লেখালেখিতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে, তাই শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা যৌক্তিক নয়।
লেখা ও জ্ঞান নিয়ে গবেষণা করা শিক্ষাবিদেরা অবশ্য এআই পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। তাঁদের মতে, সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এআই শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে ব্যাকরণ ঠিক করা, অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়া এবং বক্তব্য আরও পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে এআই কাজে আসতে পারে। তবে লেখার মূল চিন্তা ও শেখার কাজটি শিক্ষার্থীর নিজের থাকা জরুরি।
গবেষকদের মতে, এআই ছাড়া লেখা প্রয়োজন শুধু এটি কঠিন বলে নয়। লেখার সময়,পরিকল্পনা করার ক্ষমতা এবং নিজের চিন্তা নিয়ে ভাবার দক্ষতা ব্যবহার করতে হয়। নিজের বক্তব্য পরিষ্কার করতে শিক্ষার্থীরা বারবার লেখা সংশোধন করে। এভাবে লেখার অনুশীলন তাদের সমালোচনামূলক চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও গড়ে তুলতে পারে।লেখার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিজের শেখা বিষয়কে যাচাই করা।
কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে শিক্ষার্থীকে তথ্য মনে করতে হয়, নিজের ধারণা যাচাই করতে হয় এবং প্রয়োজনে পাল্টা যুক্তি ভাবতে হয়। উৎস খুঁজে বের করা ও সঠিকভাবে ব্যবহার করাও শেখার অংশ। ফলে লেখার মাধ্যমে শুধু ভাষাগত দক্ষতা নয়, বিষয় সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়াও তৈরি হতে পারে।এআইয়ের অতিরিক্ত ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণাতেও সতর্কতা পাওয়া গেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একটি ছোট গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে এআই ব্যবহার করে লেখা ও এআই ছাড়া লেখার মধ্যে পার্থক্য দেখা হয়।
গবেষণায় এআই ব্যবহারকারীদের লেখার সময় মস্তিষ্কের কার্যক্রম তুলনামূলক কম এবং নিজেদের লেখা মনে রাখার ক্ষেত্রে বেশি সমস্যা দেখা গিয়েছিল।তবে এসব গবেষণার ফলকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণার পরিসর ও পদ্ধতি নিয়ে আরও কাজ প্রয়োজন। তারপরও বিশেষজ্ঞদের একটি বড় উদ্বেগ হলো, শিক্ষার্থীরা যদি প্রতিটি ধাপে এআইয়ের ওপর নির্ভর করে, তাহলে নিজেরা চিন্তা ও লেখার অনুশীলনের সুযোগ কমে যেতে পারে। আর নিয়মিত অনুশীলন ছাড়া লেখার দক্ষতা তৈরি হওয়া কঠিন।
শিক্ষার্থীদের জন্য এআইয়ের কিছু ইতিবাচক ব্যবহারও রয়েছে। শিক্ষামনোবিজ্ঞানী স্টিভ গ্রাহামের মতে, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়, তাদের জন্য এআই বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে। ভয়েস-টু-টেক্সট, বানান ও ব্যাকরণ সংশোধন এবং লেখাকে আরও পরিষ্কার করার মতো কাজে এটি সুবিধা দিতে পারে। লেখার সময় সমালোচনার ভয় কমাতেও এআই সহায়তা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, শিক্ষার্থীদের জন্য এআই পুরোপুরি বন্ধ না করে এর ব্যবহার সীমিত ও উদ্দেশ্যপূর্ণ করা। ভাবনা তৈরি থেকে শুরু করে পুরো রচনা লিখে দেওয়ার দায়িত্ব এআইকে না দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজেদের লেখার সুযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনে লেখা শেষ করার পর এআইয়ের কাছ থেকে প্রাথমিক মতামত নেওয়া যেতে পারে। এতে প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি লেখার মৌলিক দক্ষতাও ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনির মতো কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহারে ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতির কথা বলছে। সেখানে কিছু পরীক্ষা শ্রেণিকক্ষে এআই ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার মধ্যে নেওয়া হয়। আবার অন্য কিছু পরীক্ষায় প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা যেমন নিজের দক্ষতা দিয়ে লেখার সুযোগ পায়, তেমনি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতাও অর্জন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও মানুষের নিজস্ব চিন্তা ও সৃজনশীলতার মূল্য কমবে না। বরং প্রযুক্তির যুগে নিজের ধারণা তৈরি, যুক্তি বিশ্লেষণ ও স্পষ্টভাবে তা প্রকাশ করার ক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহার করতে হলেও নিজেদের লেখার অভ্যাস ধরে রাখা প্রয়োজন। কারণ প্রযুক্তি লেখা সহজ করতে পারে, কিন্তু চিন্তার বিকাশের পুরো দায়িত্ব নিতে পারে না।



























