ঢাকা ০৬:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে দিল্লিতে তরুণদের রাতভর আন্দোলন

দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীরা। ছবি: সংগৃহীত

পুলিশের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে নয়াদিল্লির রাজপথে অবস্থান নিয়েছেন ককোরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থকেরা। জুন মাসের তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেও শত শত আন্দোলনকারী রাতভর রাস্তা ও ফুটপাতে অবস্থান করছেন। দ্বিতীয় দিনেও নতুন নতুন মানুষ আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় বিক্ষোভ আরও বড় আকার ধারণ করেছে।

 

আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা এই তরুণ চলতি মাসের শুরুতে ভারতে ফিরে আসেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল তরুণদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজপথে নিয়ে আসা।

 

ভারতের প্রায় ১৪০ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেকের বয়স ২৫ বছরের নিচে। উচ্চশিক্ষা ও চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকা তরুণদের বড় অংশ সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষার ফলাফলে অসংগতির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। সেই ক্ষোভই এখন আন্দোলনের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

 

সিজেপির দাবি, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বারবার অনিয়মের জন্য শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে দায়িত্ব নিতে হবে। আন্দোলনকারীরা মনে করেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। তাই মন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া তাদের আন্দোলন থামবে না।

 

মজার বিষয় হলো, কয়েক মাস আগেও এই আন্দোলনের ধারণাটি ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া। গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি তরুণদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করলে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। তখন অভিজিৎ দিপকে এক্সে লিখেছিলেন, ‘সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে দল বাঁধে, তবে কেমন হবে?’

 

অভিজিতের সেই পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। পরে তিনি ককোরোচ জনতা পার্টি নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে সিজেপির অনুসারী সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, যা ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকের অনুসারীর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

 

গত ৬ জুন নয়াদিল্লিতে প্রথম বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পর আন্দোলনটি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, নাগপুরসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এটি হাজারো তরুণের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

 

দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থানরত ১৮ বছর বয়সী শচীন কুমারও আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন। এক বছর কঠোর প্রস্তুতি নিয়ে তিনি মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর সেই পরীক্ষা বাতিল করা হলে তিনি গভীর হতাশায় ভেঙে পড়েন।

 

শচীন বলেন, পরীক্ষাটি বাতিল হওয়ার পর তাঁর মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট উদ্বেগ নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর তিনি আর বইও হাতে নেননি বলে জানান।

 

গত রোববার প্রায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থী পুনরায় মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেও শচীন পরীক্ষা না দিয়ে আন্দোলনস্থলেই অবস্থান করেন। তাঁর মতে, পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে এখন আর কোনো আস্থা রাখা সম্ভব নয়।

 

এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে ভারত সরকার বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রাম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এটি সমস্যার মূল সমাধান নয়। বরং শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকট মোকাবিলায় কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।

 

দুই পরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এক ডজনের বেশি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবরও সামনে এসেছে। এসব ঘটনা আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও তাই আরও জোরালো হয়েছে।

 

দিল্লি পুলিশ গত শনিবার থেকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। আন্দোলনস্থলে সাময়িকভাবে পানি ও খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হলেও বিক্ষোভকারীরা অবস্থান ছাড়েননি। রাতভর কেউ গান শুনেছেন, কেউ রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

 

অভিজিৎ দিপকে ও তাঁর সমর্থকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। দিপকের ভাষায়, সরকার যদি মনে করে ক্লান্ত করে আন্দোলন থামানো যাবে, তবে তারা ভুল করছে। আন্দোলনকারীরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথেই থাকবেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের উত্তরপ্রদেশে কোচিং সেন্টারে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ১৩

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে দিল্লিতে তরুণদের রাতভর আন্দোলন

Update Time : ০৪:২৬:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

পুলিশের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে নয়াদিল্লির রাজপথে অবস্থান নিয়েছেন ককোরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থকেরা। জুন মাসের তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেও শত শত আন্দোলনকারী রাতভর রাস্তা ও ফুটপাতে অবস্থান করছেন। দ্বিতীয় দিনেও নতুন নতুন মানুষ আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় বিক্ষোভ আরও বড় আকার ধারণ করেছে।

 

আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা এই তরুণ চলতি মাসের শুরুতে ভারতে ফিরে আসেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল তরুণদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজপথে নিয়ে আসা।

 

ভারতের প্রায় ১৪০ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেকের বয়স ২৫ বছরের নিচে। উচ্চশিক্ষা ও চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকা তরুণদের বড় অংশ সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষার ফলাফলে অসংগতির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। সেই ক্ষোভই এখন আন্দোলনের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

 

সিজেপির দাবি, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বারবার অনিয়মের জন্য শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে দায়িত্ব নিতে হবে। আন্দোলনকারীরা মনে করেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। তাই মন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া তাদের আন্দোলন থামবে না।

 

মজার বিষয় হলো, কয়েক মাস আগেও এই আন্দোলনের ধারণাটি ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া। গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি তরুণদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করলে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। তখন অভিজিৎ দিপকে এক্সে লিখেছিলেন, ‘সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে দল বাঁধে, তবে কেমন হবে?’

 

অভিজিতের সেই পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। পরে তিনি ককোরোচ জনতা পার্টি নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে সিজেপির অনুসারী সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, যা ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকের অনুসারীর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

 

গত ৬ জুন নয়াদিল্লিতে প্রথম বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পর আন্দোলনটি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, নাগপুরসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এটি হাজারো তরুণের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

 

দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থানরত ১৮ বছর বয়সী শচীন কুমারও আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন। এক বছর কঠোর প্রস্তুতি নিয়ে তিনি মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর সেই পরীক্ষা বাতিল করা হলে তিনি গভীর হতাশায় ভেঙে পড়েন।

 

শচীন বলেন, পরীক্ষাটি বাতিল হওয়ার পর তাঁর মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট উদ্বেগ নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর তিনি আর বইও হাতে নেননি বলে জানান।

 

গত রোববার প্রায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থী পুনরায় মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেও শচীন পরীক্ষা না দিয়ে আন্দোলনস্থলেই অবস্থান করেন। তাঁর মতে, পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে এখন আর কোনো আস্থা রাখা সম্ভব নয়।

 

এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে ভারত সরকার বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রাম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এটি সমস্যার মূল সমাধান নয়। বরং শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকট মোকাবিলায় কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।

 

দুই পরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এক ডজনের বেশি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবরও সামনে এসেছে। এসব ঘটনা আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও তাই আরও জোরালো হয়েছে।

 

দিল্লি পুলিশ গত শনিবার থেকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। আন্দোলনস্থলে সাময়িকভাবে পানি ও খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হলেও বিক্ষোভকারীরা অবস্থান ছাড়েননি। রাতভর কেউ গান শুনেছেন, কেউ রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

 

অভিজিৎ দিপকে ও তাঁর সমর্থকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। দিপকের ভাষায়, সরকার যদি মনে করে ক্লান্ত করে আন্দোলন থামানো যাবে, তবে তারা ভুল করছে। আন্দোলনকারীরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথেই থাকবেন।

আরও পড়ুন  সোনিয়া গান্ধী হাসপাতালে ভর্তি চিকিৎসা আপডেট