সাধারণ ক্ষমা আইন পাস করে দীর্ঘদিনের একটি দাবি পূরণ করেছে লেবানন। দেশটির পার্লামেন্ট বুধবার (১২ আগস্ট) বহুল প্রতীক্ষিত এই আইন অনুমোদন করেছে। এর ফলে হাজার হাজার কারাবন্দি ও পলাতক ব্যক্তি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ১৯৯১ সালের পর লেবাননে এ ধরনের ব্যাপক সাধারণ ক্ষমার আইন এবারই প্রথম। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এমন একটি আইনের দাবি জানানো হচ্ছিল।
সাধারণ ক্ষমা আইনটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো দেশের কারাগারগুলোর ওপর থেকে অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমানো। লেবাননের অনেক বন্দি দীর্ঘ সময় ধরে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। দেশটির জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারাগারগুলোতে অতিরিক্ত বন্দির হার ৩০০ শতাংশে পৌঁছেছে। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের শেষ নাগাদ দেশটির কারাগারগুলোতে অন্তত ৬ হাজার ২৬৮ জন বন্দি ছিলেন।
আইনটির মাধ্যমে কিছু গুরুতর সাজাও কমানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। বিলটির পক্ষে থাকা আইনপ্রণেতা ইমাদ আল-হুত জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিতদের সাজা কমিয়ে ১৭ বছর করার বিধান রাখা হয়েছে। লেবাননের কারাবিধি অনুযায়ী এক বছর সাজা নয় মাস হিসেবে গণনা করা হয়। সেই হিসাবে ১৭ বছরের সাজা কার্যকরভাবে ১২ বছর ৯ মাসের সমান হয়। তবে নতুন আইনে ঠিক কতজন ব্যক্তি সরাসরি সুবিধা পাবেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।
লেবাননে সাধারণ ক্ষমার দাবি নতুন নয়। ২০২৪ সালে সিরিয়ার দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর বিষয়টি আবারও জোরালোভাবে আলোচনায় আসে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধকে ঘিরে লেবাননে আটক হওয়া বহু ইসলামপন্থী বন্দির পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিল। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা, সংঘর্ষে অংশগ্রহণ এবং বোমা হামলার পরিকল্পনার মতো অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে উত্তর লেবাননের সুন্নি অধ্যুষিত ত্রিপোলির বহু পরিবার এই আইনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
পার্লামেন্টে আইনটি অনুমোদনের পর ত্রিপোলিতে দেখা যায় উৎসবের আমেজ। এএফপির প্রতিবেদক কয়েক ডজন মানুষকে মোটরসাইকেলে করে জড়ো হতে দেখেছেন। কেউ কেউ পতাকা বহন করেন, আবার অনেকে স্লোগান দিয়ে ও আতশবাজি পুড়িয়ে সাধারণ ক্ষমার সিদ্ধান্ত উদযাপন করেন। কারাগারে থাকা ভাইয়ের কথা উল্লেখ করে শাদি আবু ওমর বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে এই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন। তার ভাষায়, এই আইন তাদের পরিবারের ওপর থাকা অন্যায়ের বোঝা দূর করার আশা তৈরি করেছে।
তবে সাধারণ ক্ষমা আইনটি শুধু একটি সম্প্রদায়ের দাবির ফল নয়। ইরান-সমর্থিত শিয়া আন্দোলন হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিও নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্য সাধারণ ক্ষমার দাবি করে আসছিল। পূর্বাঞ্চলের বালবেক ও হারমেল এলাকার বহু পরিবার মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ ও গাড়ি চুরির মামলায় অভিযুক্ত স্বজনদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমা চেয়ে আসছিল। খ্রিষ্টান রাজনৈতিক দলগুলোরও আলাদা দাবি ছিল। তারা চেয়েছিল, ২০০০ সালে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে যাওয়ার পর ইসরায়েল-সমর্থিত বাহিনীতে যোগ দিয়ে পরে ইসরাইলে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারও যেন আইনের আওতায় আসে। এর আগে ১৯৭৫-১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধের পর লেবাননে সাধারণ ক্ষমার আইন করা হয়েছিল। নতুন আইন তাই দেশটির দীর্ঘ রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।




























