দেশজুড়ে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। বৈরী আবহাওয়া, এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, কয়লা সংকট এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এর ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। সংকট কাটিয়ে উঠতে আরও অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে প্রায় প্রতিটি ঘণ্টাতেই ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা গেছে। এক পর্যায়ে চাহিদা ১৭ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। এতে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াটে। রাতের দিকে ঘাটতি আরও বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছেছে।
সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত। মহেশখালীর সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন কার্গো খালাস করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালও কারিগরি সমস্যায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গিয়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও ব্যাপকভাবে কমেছে।
দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও গ্যাসের অভাবে বর্তমানে মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কয়লা সরবরাহের সংকট। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসে বিঘ্ন ঘটায় কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। একই সময়ে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে। কোথাও কোথাও কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ। বিভিন্ন এলাকায় দিনে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এতে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকাতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। কেরানীগঞ্জ, বাড্ডা, পান্থপথ, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে।
দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। কোথাও বিদ্যুৎ অফিসে হামলা, ভাঙচুর এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করার ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশের বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা চেয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে বলা হয়েছে। সন্ধ্যা ৭টার পর আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা এড়িয়ে চলার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
সরকার একই সঙ্গে গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে নতুন এলএনজি কার্গো আনার চেষ্টা চলছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই আমদানি করা জ্বালানি এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।


























