এবারের পবিত্র হজ মৌসুমে দেশের হজযাত্রীদের মধ্যে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ফ্লাইট সূচি বিপর্যয়, দীর্ঘ অপেক্ষা কিংবা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর না থাকায় যাত্রীরা সন্তোষ প্রকাশ করছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও সার্বক্ষণিক তদারকির কারণে এবার হজ কার্যক্রম অনেক বেশি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সৌদি এয়ারলাইন্স এবং ফ্লাই নাসের মোট ৮৪টি ফ্লাইটে ৩৩ হাজার ৩১৮ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। আশকোনা হজ ক্যাম্প সূত্র জানিয়েছে, যাত্রী পরিবহন কার্যক্রম এখন পর্যন্ত নির্বিঘ্ন রয়েছে এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে।
হজ ক্যাম্পে সরেজমিনে দেখা গেছে, দূরদূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তা পাচ্ছেন। গেটেই যাত্রীদের ব্যাগ বহন, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এবং নিবন্ধন কার্যক্রমে সহায়তা করা হচ্ছে। এতে বয়স্ক যাত্রী ও নারীরা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। ক্যাম্পের নির্ধারিত আবাসন কক্ষগুলোও নতুনভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিটি ডরমেটরিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যাত্রীদের বিশ্রামের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা দেখা গেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হজযাত্রীদের আরাম ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যাত্রীরা যাতে কোনো অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তিতে না পড়েন, সেজন্য প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা উপস্থিত রয়েছেন।
হজ ক্যাম্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। সম্প্রতি অর্থ চুরির একটি ঘটনার পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এরপর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এখন প্রবেশপথ, আবাসন এলাকা ও যাত্রী চলাচল এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারি রাখা হচ্ছে। খাবার নিয়েও যাত্রীদের কিছু অভিযোগ ওঠার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যটন করপোরেশনের সরবরাহ করা খাবারের মান নিয়ে আপত্তি জানালে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে বলে জানা গেছে। হজ ক্যাম্পে আগত প্রত্যেক যাত্রীকে প্রবেশের সময় বোতলজাত বিশুদ্ধ পানি দেওয়া হচ্ছে।
গরম আবহাওয়ায় এটি যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে দূরপাল্লার পথ পাড়ি দিয়ে আসা মানুষেরা এতে উপকৃত হচ্ছেন।এছাড়া লাগেজ মোড়ানোর জন্য ক্যাম্পে বিশেষ যন্ত্র বসানো হয়েছে। ফলে যাত্রীরা বিনা মূল্যে তাদের মালামাল সুরক্ষিতভাবে মোড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন। এতে ব্যাগ ক্ষতি, ছিঁড়ে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীদের ইমিগ্রেশন কার্যক্রম ঢাকাতেই সম্পন্ন করা হচ্ছে। এতে সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর যাত্রীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না। বিশেষ করে বয়স্ক যাত্রীদের জন্য এই ব্যবস্থা বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে।
মশাপ্রবণ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও হজ ক্যাম্পে মশার উপদ্রব তুলনামূলক কম। দিনে কয়েকবার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে এবং কক্ষগুলোতে মশা প্রতিরোধক স্প্রে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পুরো ক্যাম্প এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে। হজযাত্রীরা বলছেন, আগের বছরের তুলনায় এবার ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন রয়েছে। সিরাজগঞ্জ থেকে আসা এক যাত্রী বলেন, ক্যাম্পে এসে কোনো বিশৃঙ্খলা দেখেননি। দ্রুত কাজ শেষ হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তাও পাওয়া গেছে। বগুড়া থেকে আসা আরেক যাত্রী জানান, যাত্রাপথে জ্বালানি সংকটের কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও ক্যাম্পে পৌঁছে দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, কর্মীদের সহযোগিতামূলক আচরণ তাদের স্বস্তি দিয়েছে।
কয়েকটি হজ এজেন্সির প্রতিনিধিরাও বলছেন, এবার যাত্রী ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় আগের চেয়ে ভালো। স্বেচ্ছাসেবক, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ায় কাজ সহজ হয়েছে। হজ ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনকারী স্বেচ্ছাসেবকদেরও সক্রিয় দেখা গেছে। যাত্রীদের কাগজপত্র যাচাই, সঠিক কক্ষে পৌঁছে দেওয়া, লাগেজ ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য সহায়তায় তারা কাজ করছেন। এতে যাত্রীদের চাপ কমছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হজযাত্রা একটি বড় আকারের ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম। এখানে হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত, আবাসন, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবহন একসঙ্গে সামলাতে হয়। তাই আগাম পরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকি থাকলে সাফল্য পাওয়া সম্ভব।
তারা আরও বলেন, এবার যদি সময়মতো ফ্লাইট পরিচালনা অব্যাহত থাকে এবং ক্যাম্পের সেবার মান ধরে রাখা যায়, তাহলে পুরো হজ মৌসুম আরও স্বস্তিদায়ক হবে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সামনে যেসব ফ্লাইট রয়েছে সেগুলোও একইভাবে পরিচালিত হবে। যাত্রীদের সুবিধা, নিরাপত্তা এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক কাজ করছে। সব মিলিয়ে এবারের হজ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে। সময়মতো ফ্লাইট, দ্রুত প্রক্রিয়া, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং যাত্রীবান্ধব সেবার কারণে অনেকেই বলছেন, নির্বিঘ্ন হজযাত্রায় স্বস্তির নিঃশ্বাস এখন বাস্তব অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
























