রাজধানীতে আয়োজিত এক জাতীয় কনভেনশনে গণভোট ও জুলাই সনদ ইস্যুতে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে তিনি অভিযোগ করেন, জনগণের রায় উপেক্ষা করা হলে তা “অন্তহীন প্রতারণা” হিসেবে বিবেচিত হবে।
রোববার (৩ মে) বিকেলে কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী জাতীয় কনভেনশনের সমাপনী পর্বে এসব কথা বলেন তিনি। ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, সংস্কার ও গণভোটবিষয়ক জাতীয় কনভেনশন’ শীর্ষক এই আয়োজন করে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি।
গোলাম পরওয়ার তার বক্তব্যে বলেন, সাম্প্রতিক গণভোটে বিপুলসংখ্যক ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদের পক্ষে মত দিয়েছেন এবং বিএনপির দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই রায় শুধু সাধারণ জনগণই নয়, সরকারের পক্ষ থেকেও সমর্থন পেয়েছিল। তাই এখন সংসদে ভিন্ন অবস্থান নেওয়া জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শামিল।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “প্রধানমন্ত্রী নিজেই যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানান, তবে সংসদে দাঁড়িয়ে সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কীভাবে করেন?” এ ধরনের অবস্থানকে তিনি রাজনৈতিক অসঙ্গতি এবং জনগণের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবে উল্লেখ করেন।
সংসদের আসন্ন বাজেট অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের দাবি জানান জামায়াতের এই নেতা। তার মতে, বর্তমান রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে সরকার নিজেই, তাই সংকট নিরসনের দায়িত্বও তাদেরই নিতে হবে। তিনি রূপকভাবে বলেন, “বল এখন সরকারের কোর্টে। সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।”
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে বর্তমান সরকারই প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও, ক্ষমতায় আসার আগে সরকার গণভোট নিয়ে কোনো আপত্তি তোলেনি। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর হঠাৎ করে সেই অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে, যা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার বিরোধী দলকে দোষারোপ করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তার মতে, প্রকৃতপক্ষে বিভ্রান্তি তৈরি করছে সরকার নিজেই, কারণ তারা গণভোটের রায় ও জুলাই সনদের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করছে।
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের বিপুল ভোটকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংসদ কখনোই জনগণের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান নয়। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটই সর্বোচ্চ ক্ষমতার উৎস।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং তাদের ক্ষমতা ডেলিগেটেড বা অর্পিত। কিন্তু গণভোটে জনগণ সরাসরি তাদের মতামত প্রদান করে, যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এই কনভেনশনের সমাপনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। এতে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল এবং নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিব আনোয়ার।
বিশ্লেষকদের মতে, গণভোট ও সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে সরকারের অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়ে উঠছে।

























