লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার বনচৌকি সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হওয়ার ঘটনা নতুন করে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নিহত যুবকের নাম মো. খাদেমুল ইসলাম (২৫)। তিনি উপজেলার উত্তর আমঝোল গ্রামের বাসিন্দা এবং আমজাদ হোসেনের ছেলে।
বুধবার (১৩ মে) গভীর রাতে সীমান্তের বনচৌকি বিওপি সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র এবং বিজিবি জানিয়েছে, রাত আনুমানিক ২টার দিকে কয়েকজন বাংলাদেশি সীমান্তের কাঁটাতারের কাছাকাছি গেলে ভারতীয় ৭৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের পাগলামারী ক্যাম্পের টহল দল তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে খাদেমুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হন।
জানা গেছে, ঘটনাস্থলটি সীমান্ত পিলার ৯০৫/৬ এস সংলগ্ন এলাকা। অভিযোগ রয়েছে, গুলির সময় তারা ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ১৫০ গজ ভেতরে অবস্থান করছিলেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গুরুতর আহত অবস্থায় খাদেমুল দ্রুত বাংলাদেশের ভেতরে ফিরে আসেন। পরে স্থানীয় লোকজন ও তার সঙ্গে থাকা সহযোগীরা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য রংপুরের একটি ক্লিনিকে ভর্তি করেন।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতেই খাদেমুল ইসলামের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের সদস্যরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং সীমান্তে নিরীহ মানুষ হত্যার বিচার দাবি করেছেন।
নিহতের স্বজনরা জানান, খাদেমুল পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন। তার মৃত্যুতে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সীমান্ত এলাকায় প্রায়ই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং মাঝেমধ্যেই বিএসএফের গুলির ঘটনা ঘটে। তারা সীমান্তে নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দুই দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের (১৫ বিজিবি) কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বিএসএফের গুলিতে একজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তবে কী কারণে বিএসএফ গুলি চালিয়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় প্রায়ই বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানোর ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অতীতেও একাধিকবার গুলিতে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন সময় আলোচনা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
খাদেমুল ইসলামের মৃত্যুর পর হাতিবান্ধা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, সীমান্তে মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। তারা সীমান্তে প্রাণহানি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বিচার এবং সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। সীমান্ত এলাকায় এমন মর্মান্তিক ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।






















