চট্টগ্রামে সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং বর্ষীয়ান রাজনীতিক মোশাররফ হোসেনের জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছে। নগরের জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই জানাজায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, ব্যবসায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পুরো এলাকা জুড়ে ছিল শোকের আবহ। অনেকের চোখে দেখা যায় অশ্রু, আবার কেউ কেউ স্মরণ করেছেন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদানের কথা।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ এলাকায় মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত জানাজায় হাজারো মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়। পরে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়ি মিরসরাইয়ের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
জানাজার সময় উপস্থিত মানুষের মধ্যে শোকের পাশাপাশি আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কিছু লোকজনকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতেও দেখা যায়। পুরো এলাকা ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল জোরদার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানাজাস্থল ও আশপাশের এলাকায় সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।
মোশাররফ হোসেন বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শ্বাসতন্ত্রের জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। অসুস্থতার কারণে বেশ কিছু সময় হাসপাতালেও চিকিৎসাধীন ছিলেন।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন। তিনি বিএনপি, সিটি করপোরেশন এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করেন। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বলেন, মোশাররফ হোসেন ছিলেন বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী একজন নেতা। বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নে তাঁর অবদান মানুষ দীর্ঘদিন স্মরণ করবে।
তিনি আরও বলেন, মিরসরাইয়ের সন্তান হলেও তিনি পুরো চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
জানাজায় বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, সিপিবির সাবেক সভাপতি শাহ আলম এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান। বক্তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে মোশাররফ হোসেনের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন।
তাঁরা বলেন, মোশাররফ হোসেন ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক ও উন্নয়নমুখী রাজনীতিক। চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, আবাসন খাত এবং শিল্পায়নে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে মোশাররফ হোসেনের বড় ছেলে সাবেদুর রহমান উপস্থিত সবার কাছে তাঁর বাবার জন্য দোয়া চান। আবেগঘন বক্তব্যে তিনি বলেন, তাঁদের পরিবারের জন্য এটি অত্যন্ত কষ্টের সময়। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, তাঁর বাবার আচরণে কেউ যদি কোনো সময় কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করা হচ্ছে। এ সময় উপস্থিত মানুষের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
চট্টগ্রাম-১ আসন তথা মিরসরাই থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মোশাররফ হোসেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। দলে সর্বশেষ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
প্রকৌশলবিদ্যায় পড়াশোনা করা মোশাররফ হোসেন ছিলেন একাধারে রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও শিল্পোদ্যোক্তা। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা ছিল আলোচিত।
রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি তিনি ব্যবসা ও শিল্প খাতেও সফলতা অর্জন করেন। স্থানীয় উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
তবে জীবনের শেষ সময়ে নানা আইনি জটিলতায়ও পড়তে হয় তাঁকে। ২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনে বিএনপি কার্যালয়ে হামলা এবং বিএনপি কর্মী মকবুল হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
পরে আরও কয়েকটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সব মামলায় জামিন পেয়ে ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
মুক্তির পরও তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরিবার সূত্রে জানা যায়, শেষ কয়েক মাসে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। অবশেষে বুধবার তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন অনেকে।
চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ সময় প্রভাব বিস্তারকারী এই নেতার মৃত্যুতে মিরসরাইসহ পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মানুষের অনেকেই বলছেন, উন্নয়ন ও নেতৃত্বের কারণে তিনি দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়ি মিরসরাইয়ে নেওয়া হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।





















