তরুণদের সুরক্ষায় তামাক ও নিকোটিন পণ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)। বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬ উপলক্ষে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, নতুন প্রজন্মকে নিকোটিন আসক্তির ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আগামীকাল রোববার (৩১ মে) বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালিত হবে। এ বছর দিবসটির বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আনমাস্কিং দ্য অ্যাপিল – কাউন্টারিং নিকোটিন অ্যান্ড টোব্যাকো অ্যাডিকশন’। বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি’ এই প্রতিপাদ্যে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক ও নিকোটিন কোম্পানিগুলো বর্তমানে তাদের বিপণন কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। প্রচলিত সিগারেটের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের নিকোটিন পণ্যকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।
বিশেষ করে ই-সিগারেট, ভেপিং ডিভাইস, নিকোটিন পাউচ ও অনুরূপ পণ্যগুলোকে আধুনিক জীবনধারার অংশ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। রঙিন ডিজাইন, বিভিন্ন স্বাদের ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে এসব পণ্যের প্রতি তরুণদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর মতে, এসব পণ্যকে অনেক সময় ‘নিরাপদ’ কিংবা ‘কম ক্ষতিকর’ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর মাধ্যমে নিকোটিন আসক্তি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য।
সম্প্রতি বাংলাদেশে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাস হয়েছে। জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট মহলে এই আইনকে তামাক নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সংশোধিত আইনে ই-সিগারেট, ভেপিং পণ্য, নিকোটিন পাউচ এবং অন্যান্য নতুন প্রজন্মের তামাকপণ্য নিষিদ্ধ করার বিধান অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এই শূন্যতা ভবিষ্যতে তরুণদের মধ্যে নতুন ধরনের নিকোটিন আসক্তি ছড়িয়ে দিতে পারে।
প্রজ্ঞার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তামাক কোম্পানিগুলো নতুন প্রজন্মের পণ্য বাজারজাত করার ক্ষেত্রে তরুণদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে। কারণ এই বয়সের মানুষদের মধ্যে নতুন পণ্যের প্রতি আগ্রহ বেশি এবং তারা সহজেই বিপণন কৌশলের প্রভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে নতুন প্রজন্মের তামাক ও নিকোটিন পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে এসব পণ্যের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে নতুন নতুন গবেষণাও প্রকাশিত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বাংলাদেশেও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক বাজারের মাধ্যমে এসব পণ্যের বিস্তার ঘটছে। নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে বয়স যাচাই ছাড়াই এসব পণ্য ক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে, যা শিশু ও কিশোরদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিকোটিন এমন একটি উপাদান যা দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। কৈশোর ও তরুণ বয়সে নিকোটিন গ্রহণ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন আচরণগত ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তামাক ব্যবহারের কারণে শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এর প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপরও। তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা ব্যয় এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের কারণে রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
প্রজ্ঞার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহার করে। এই বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারী দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতিবছর তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে দেশে প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, ফুসফুসের জটিলতা এবং শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগের সঙ্গে তামাক ব্যবহারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে চিকিৎসকরা উল্লেখ করেছেন।
শুধু স্বাস্থ্যগত ক্ষতিই নয়, তামাক চাষ ও উৎপাদন পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বন উজাড়, মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং পানিদূষণের মতো সমস্যার সঙ্গে তামাক শিল্পের সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
প্রজ্ঞার হিসাবে, ২০২৪ সালে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের ফলে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ তামাক খাত থেকে সরকারের অর্জিত রাজস্ব আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক থেকে অর্জিত রাজস্বকে অনেক সময় অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং পরিবেশগত ক্ষতির হিসাব যুক্ত করলে প্রকৃত চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়।
বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, তরুণদের তামাক ও নিকোটিন আসক্তির ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে ই-সিগারেট ও ভেপিংসহ সব নতুন প্রজন্মের তামাকপণ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন প্রজন্মের এসব পণ্যকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বন্ধ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রজ্ঞা মনে করে, তামাকমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে সদ্য পাস হওয়া তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে তামাক কোম্পানিগুলোর নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে সুস্পষ্ট নীতিমালা গ্রহণ জরুরি।
সংস্থাটি আরও বলেছে, আসন্ন জাতীয় বাজেটে সব ধরনের তামাকপণ্যের ওপর কার্যকরভাবে কর ও মূল্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এতে বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে এসব পণ্য চলে যাবে এবং ব্যবহার কমবে।
জনস্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, তামাক নিয়ন্ত্রণে আইন, করনীতি, সচেতনতা কার্যক্রম এবং কঠোর নজরদারি—সবকিছুর সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন। তাহলেই তামাক ও নিকোটিন আসক্তির বিস্তার রোধ করে একটি সুস্থ ও তামাকমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে।





























