দেশে হামে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু হওয়ার খবর নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম এবং হাম-সংশ্লিষ্ট উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪৮ জনে। শনিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে দেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতির সর্বশেষ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। যদিও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে, তবুও এ ঘটনাগুলো স্বাস্থ্যখাতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৬৩ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ৭৬৩ জনকে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দেশে এখনও সংক্রমণের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং নতুন রোগী শনাক্তের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৯২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ৫৫৬ জন। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা এখন ৬৪৮ জনে পৌঁছেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যুর এই উচ্চ সংখ্যা দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ এবং জটিলতা বৃদ্ধির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া এর প্রধান লক্ষণ। শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি কখনও কখনও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে এবং নিউমোনিয়া, অপুষ্টি বা অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নিশ্চিত হাম আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২৪৮ জনে। অন্যদিকে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ৮৪ হাজার ৮৯৯ জনে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে রোগটির বিস্তার এখনও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন অথবা পরীক্ষার আওতায় আসছেন না। ফলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হামের বিস্তার রোধে টিকাদান কর্মসূচির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান এবং বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শক্তিশালী করা গেলে সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও শিশুদের টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করতে সচেতন হতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে ভর্তি করানো জরুরি। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখার মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জনগণকে হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের জ্বর, ফুসকুড়ি বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
দেশে হামের প্রকোপ অব্যাহত থাকায় স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে টিকাদান, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না গেলে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।




























