ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য আপাতত দুঃসংবাদই অপেক্ষা করছে। চিকিৎসকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলোতে নেইমারকে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে চোট কাটিয়ে অনুশীলনে ফেরায় তাঁর বিশ্বকাপ মিশন এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে নকআউট পর্বে ব্রাজিলের হয়ে মাঠে ফিরতে পারেন এই তারকা ফুটবলার।
বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকেই নেইমারের ফিটনেস নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে ব্রাজিল শিবির। দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়কে ছাড়া আক্রমণভাগে প্রত্যাশিত ছন্দ খুঁজে পেতে কিছুটা সংগ্রামও করতে হয়েছে সেলেসাওদের। তাই তাঁর ফেরার অপেক্ষায় এখন পুরো দল এবং কোটি কোটি সমর্থক।
গত ২৮ মে তেরেসোপোলিসের গ্রানজা কোমারিতে ব্রাজিল দলের চিকিৎসক রদ্রিগো লাসমার জানিয়েছিলেন, নেইমারের ডান পায়ের কাফে হওয়া গ্রেড-২ চোট পুরোপুরি সেরে উঠতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। তবে সেই সময়সীমা সরাসরি ম্যাচে ফেরার নিশ্চয়তা ছিল না।
মূলত চিকিৎসকদের হিসাব ছিল, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তিনি কবে মাঠের অনুশীলনে ফিরতে পারবেন এবং চিকিৎসা শেষে পুনর্বাসনের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করবেন। সেই লক্ষ্য অনুযায়ীই এখন পর্যন্ত এগোচ্ছেন ব্রাজিলের নাম্বার টেন।
গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মরিসটাউনে ব্রাজিল দলের অনুশীলন কেন্দ্র কলাম্বিয়া পার্কে হালকা অনুশীলনে অংশ নেন নেইমার। চিকিৎসকদের নির্ধারিত সর্বোচ্চ সময়সীমার একদিন আগেই মাঠে ফেরা তাঁর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এরপর সংবাদমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত রাখা সংক্ষিপ্ত অনুশীলন সেশনেও দেখা গেছে তাঁকে। ফিজিক্যাল প্রিপারেশন কোঅর্ডিনেটর ক্রিস্তিয়ানো নুন্নেসের তত্ত্বাবধানে বলসহ ও বল ছাড়া বিভিন্ন অনুশীলন করেছেন তিনি।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় ছিল, অনুশীলনের সময় নেইমারের পায়ে বুট দেখা গেছে। সাধারণত পেশির চোট থেকে সেরে ওঠা খেলোয়াড়দের জন্য এটি পুনর্বাসনের উন্নত ধাপে পৌঁছে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়।
ব্যক্তিগত ড্রিলের পাশাপাশি সতীর্থদের সঙ্গে একটি বৃত্তাকার পাসিং অনুশীলনেও অংশ নিয়েছেন তিনি। যদিও পুরো দলের সঙ্গে শতভাগ স্বাভাবিক অনুশীলনে ফিরতে এখনো কিছুটা সময় বাকি রয়েছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের নির্ধারিত ধাপ অনুযায়ী, নেইমার বর্তমানে পুনর্বাসনের প্রাথমিক মাঠপর্যায়ে আছেন। এই ধাপে হালকা দৌড়, সোজা লাইনে চলাফেরা, ছোট স্প্রিন্ট এবং বলের সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত অনুশীলন করা হয়।
সাধারণত গ্রেড-২ পেশির চোটে এই পর্যায় এক থেকে তিন দিন স্থায়ী হয়। এই সময়ে অনুশীলনের পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় শরীরে কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলে ধীরে ধীরে কাজের চাপ বাড়ানো শুরু করা হয়।
এরপর দুই থেকে চার দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আসে, যেখানে খেলোয়াড়ের শরীরে ক্রমান্বয়ে লোড বাড়ানো হয়। এই ধাপ সফলভাবে শেষ করতে পারলেই পরবর্তী এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করা যায়।
এই পর্যায়ের নাম এক্সপ্লোসিভ মুভমেন্ট। এখানে সর্বোচ্চ গতির ৮৫ শতাংশের বেশি শক্তি ব্যবহার করে স্প্রিন্ট, দ্রুত দিক পরিবর্তন, হঠাৎ থামা এবং গতি বাড়ানোর অনুশীলন করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনরায় চোটে পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে এই সময়টাতেই। তাই কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো করার সুযোগ নেই এবং প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয়।
এই ধাপ সফলভাবে শেষ হলে শুরু হয় বলের সঙ্গে নির্দিষ্ট কৌশলগত অনুশীলন। এরপর আংশিক দলীয় সেশন এবং পূর্ণাঙ্গ দলীয় অনুশীলনে অংশ নিতে হয়, যা সম্পন্ন করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগে।
সব ধাপের ন্যূনতম সময় বিবেচনায় নিলে প্রায় নয় দিনের মধ্যে মাঠে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়। অন্যদিকে সর্বোচ্চ সময়সীমা ধরলে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে ২৪ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
সেই হিসাবে, ১৬ বা ১৭ জুন মাঠে অনুশীলন শুরু করা নেইমার সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতিতে ২৬ জুনের দিকে ম্যাচ খেলার ছাড়পত্র পেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ২৯ জুনের নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচে তাঁকে দেখা যেতে পারে।
তবে ব্রাজিল মেডিকেল টিম কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। তাদের রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ী, ৩০ জুন থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে নেইমারের ফেরার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, যা শেষ ষোলো কিংবা কোয়ার্টার ফাইনালের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।
বর্তমান ফুটবলে কোনো খেলোয়াড়ের মাঠে ফেরার সিদ্ধান্ত শুধু ব্যথা কমে যাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। শরীর উচ্চমাত্রার চাপ সহ্য করতে পারছে কি না এবং পরদিন কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়।
এই মুহূর্তে নেইমারের উন্নতি ব্রাজিল শিবিরে আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের মূল লক্ষ্য একটাই—তাড়াহুড়ো না করে তাঁকে শতভাগ ফিট অবস্থায় মাঠে ফিরিয়ে আনা।
সব মিলিয়ে ব্রাজিল সমর্থকদের অপেক্ষা আরও কিছুদিন দীর্ঘ হতে যাচ্ছে। গ্রুপ পর্বে নেইমারকে দেখা না গেলেও নকআউট পর্বে তাঁর প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।




























