মালয়েশিয়ায় দুই দিনের সরকারি সফর শেষ করে চীনে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তাঁর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। সফরকে ঘিরে বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার লক্ষ্যে এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের দালিয়ান ও বেইজিংকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিভিন্ন কর্মসূচি সাজানো হয়েছে। দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বেইজিংয়ে চীনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করবেন তিনি। এসব বৈঠকে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এবারের সফরে বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক সহযোগিতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অতীতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থায়ন বেশি আলোচনায় থাকলেও এবার বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বের বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, সফর চলাকালে চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও প্রটোকল মিলিয়ে অন্তত ১৫ থেকে ১৭টি দলিল সই হতে পারে। এসব দলিলের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কারিগরি শিক্ষা, গণমাধ্যম সহযোগিতা এবং বন্দর উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বেইজিংয়ে দিনের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ অংশ নেন। সেখানে তিনি চীনা বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অর্থনীতি, বৃহৎ বাজার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বিনিয়োগ সম্মেলনে চীনের বিভিন্ন শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এই সম্মেলনের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমঝোতা ও বিনিয়োগ চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চীনের বিখ্যাত শিল্পপ্রতিষ্ঠান চেরি গ্রুপ, হানদা গ্রুপ এবং চায়নাট্যাক্স করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে অটোমোবাইল, প্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্প এবং অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয় আলোচনা করা হবে।
চীনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা (সিডকা) এবং চায়না এক্সিম ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এসব আলোচনায় বাংলাদেশে চলমান ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন, ঋণ সহযোগিতা এবং কারিগরি সহায়তার বিষয় গুরুত্ব পাবে।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। দুই দেশের প্রতিনিধিদল নিয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
বিশেষভাবে আলোচনায় আসতে পারে বহুল আলোচিত তিস্তা বৃহৎ প্রকল্প। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের অংশগ্রহণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিনিময় হতে পারে। তিস্তা অববাহিকার উন্নয়ন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এবারের সফরে চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ বা জিডিআইয়ে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিডিআইয়ে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। এটি ভবিষ্যতে উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পর্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বৈঠকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের উদ্যোগ। রাজনৈতিক দল পর্যায়ে এই সহযোগিতা ভবিষ্যতে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করতে সহায়তা করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
চুক্তির তালিকায় রয়েছে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সংস্কার, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদন, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষায় সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এছাড়া গণমাধ্যম সহযোগিতা জোরদারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।
চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সড়ক ও সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের অবদান রয়েছে। ফলে এই সফরের মাধ্যমে বিদ্যমান সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সফর সেই ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, টেকসই উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনী অর্থনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে মতবিনিময় করেন। এতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সফরকালে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভের সঙ্গেও তারেক রহমানের সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। সেখানে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক মিশন স্থাপন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দক্ষ জনশক্তি বিনিময়ের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ইতোমধ্যে সোনালি ৫০ বছরে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঐতিহাসিক ও সময়োপযোগী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
সফর শেষে দুই দেশের নেতাদের উপস্থিতিতে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। এসব চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, অবকাঠামো ও বাণিজ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সুবিধা পেতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর শুধু একটি কূটনৈতিক সফর নয়, বরং এটি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিনিয়োগ, রাজনৈতিক সহযোগিতা এবং উন্নয়ন অংশীদারত্বের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আগামী দিনে আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।



























