পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুর্কিনা ফাসো আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রান্স-এর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পারস্পরিক সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়া এ সিদ্ধান্ত আফ্রিকার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক আস্থা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান—এসব মৌলিক শর্ত আর বিদ্যমান নেই। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করছে বুর্কিনা ফাসোর সরকার।
সরকারের মুখপাত্র ও যোগাযোগমন্ত্রী গিলবার্ট ওয়েদ্রাওগো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিবৃতিতে জানান, এই সিদ্ধান্ত কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা সম্পর্কের অবনতির ফল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাস ও সহযোগিতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং নতুন বাস্তবতায় সরকারের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা জরুরি হয়ে উঠেছিল।
বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, ফ্রান্স বুর্কিনা ফাসোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে এবং দেশটির স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। এমনকি কিছু “ধ্বংসাত্মক নেটওয়ার্ক” ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অতীতেও অস্বীকার করেছে ফ্রান্স।
যদিও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়েছে, তবুও বুর্কিনা ফাসো সরকার স্পষ্ট করেছে যে এ সিদ্ধান্ত দুই দেশের জনগণের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক সম্পর্কের বিরুদ্ধে নয়। সরকার জানিয়েছে, দেশটিতে অবস্থানরত ফরাসি নাগরিকসহ সব বিদেশির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং সাধারণ জনগণকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনের উত্তেজনার চূড়ান্ত রূপ। ২০২২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ফ্রান্স ও বুর্কিনা ফাসোর সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে অবনতি হতে থাকে। একের পর এক ফরাসি কূটনীতিক বহিষ্কার, সামরিক সহযোগিতা বন্ধ এবং ফরাসি বাহিনীর প্রত্যাহারের মতো পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্কে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়।
বুর্কিনা ফাসো বর্তমানে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র জঙ্গি হামলা ও নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি। এই পরিস্থিতিতে দেশটির সামরিক সরকার জাতীয় সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে আসছে। একই সঙ্গে তারা পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নতুন অংশীদার খোঁজার নীতিও অনুসরণ করছে।
সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে তারা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। তাদের দাবি, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাই হবে পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।
এদিকে সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি ফ্রান্স। তবে অতীতে বুর্কিনা ফাসোর তোলা অভিযোগগুলো প্যারিস প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বুর্কিনা ফাসোর এই পদক্ষেপ শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই নয়, পুরো সাহেল অঞ্চলের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও নতুন প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অঞ্চলটির কয়েকটি দেশ তাদের সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করছে। ফলে এই সিদ্ধান্ত পশ্চিম আফ্রিকার ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।





























