দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৮৩৩ শিশু। সর্বশেষ এই তথ্য প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংস্থাটি জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় নজরদারি, চিকিৎসাসেবা ও টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
শনিবার (৪ জুলাই) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং চিকিৎসাধীন শিশুদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এই সময়ে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। তবুও উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৬৩৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে আরও ৯৩ শিশু। সব মিলিয়ে এই সময়ের মধ্যে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৭৩১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ১০১ শিশু। পাশাপাশি হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩২ জন। ফলে একদিনেই মোট নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৮৩৩ জনে পৌঁছেছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত একদিনে নতুন করে ৭০৪ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে ৬৭৫ শিশু হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। এতে বোঝা যায়, প্রতিদিনই হাসপাতালে নতুন রোগী আসছে, আবার অনেকেই সুস্থ হয়ে ছাড়পত্রও পাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৪ হাজার ৬৯৩ জন। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১২ হাজার ৫২৬ জন।
এ সময়ের মধ্যে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৮৭ হাজার ৯৬৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা শেষে এখন পর্যন্ত ৮৪ হাজার ২১৮ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন। বাকিদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারেন। বিশেষ করে যেসব শিশু টিকা নেয়নি বা যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
হামের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতাও তৈরি হতে পারে, যা শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো এমআর (হাম-রুবেলা) টিকা গ্রহণ। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নির্ধারিত বয়সে টিকা নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
অভিভাবকদের প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরামর্শ, কোনো শিশুর জ্বরের সঙ্গে শরীরে র্যাশ বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করানো উচিত নয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার ও তরল খাবার খাওয়ানো জরুরি। এতে জটিলতা কমানোর পাশাপাশি দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।
সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে আক্রান্ত এলাকার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে যাতে সংক্রমণ আরও বিস্তার লাভ না করে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিকাদান কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, সম্মিলিত উদ্যোগে হামের সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যুর হার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।





























