বাংলাদেশ দল ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শুধু একটি টেস্ট জয় করেনি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য তৈরি করেছে অন্য রকম এক আনন্দের দিন। মারারা স্টেডিয়ামের গ্যালারি পুরোপুরি ভরা না থাকলেও সেখানে উপস্থিত বাংলাদেশিদের আবেগ ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ ডারউইনেই থাকেন, কেউ আবার সিডনি কিংবা ব্রিসবেন থেকে উড়ে এসেছেন শুধু দেশের খেলা দেখতে। শেষ পর্যন্ত সেই যাত্রা সার্থক হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের সরাসরি সাক্ষী হয়ে বাড়ি ফিরেছেন তাঁরা।
ডারউইনে পড়াশোনা করতে আসা আল মাশরুক ভূঁইয়ার জন্য দিনটি ছিল বিশেষ। অস্ট্রেলিয়ায় ডেটা সায়েন্সে মাস্টার্স করছেন তিনি। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর হঠাৎ দেশের ক্রিকেটকে ঘিরে এমন আবেগের মধ্যে থাকতে পারা তাঁর কাছে সৌভাগ্যের বিষয়। বাংলাদেশ দল যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলবে, সেটি হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি। তাঁর মতো অনেক প্রবাসীর কাছে ম্যাচটি তাই শুধুই ক্রিকেট ম্যাচ ছিল না; দেশের সঙ্গে আবেগের একটি নতুন সংযোগও তৈরি করেছে।
সিডনি থেকে ডারউইনে এসেছিলেন সরুদ্দিন। পরিকল্পনা ছিল কয়েক দিন মাঠে বসে টেস্ট দেখবেন। কিন্তু বাংলাদেশ দল যখন জয়ের একেবারে দ্বারপ্রান্তে, তখন পরিকল্পনাই বদলে ফেলেন তিনি। ফ্লাইট বাতিল করে থেকে যান ডারউইনে। তাঁর চাওয়া ছিল একটাই—বাংলাদেশের জয়টা মাঠে বসে উদ্যাপন করবেন। দেশের বাইরে থেকেও দেশের সাফল্যের মুহূর্তে পাশে থাকার এই আকাঙ্ক্ষাই প্রবাসীদের আবেগটা কতটা গভীর, সেটি যেন আরও পরিষ্কার করে দিয়েছে।
ডারউইনের সিআইএম ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করা জিসানও বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে এসেছিলেন। চট্টগ্রামের এই তরুণের কাছে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্স ছিল গর্বের বিষয়। দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশের খেলা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সামনে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন তাঁরা। আরও ভালো লাগার বিষয় ছিল, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটার ও সমর্থকদের কাছ থেকেও বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের প্রশংসা শোনা গেছে। ফলে মাঠের আনন্দটা শুধু বাংলাদেশিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ম্যাচের শেষদিকে অস্ট্রেলিয়ানদের হতাশার মধ্যেও বাংলাদেশের প্রতি সম্মান স্পষ্ট ছিল।
মারারা স্টেডিয়ামে এমন একটি পরিবারকেও পাওয়া গেছে, যারা বহু বছর ধরে ডারউইনে বসবাস করছেন এবং আগেও বাংলাদেশের খেলা মাঠে বসে দেখেছেন। ১৯৯৯ সাল থেকে ডারউইনে থাকা সদরুদ্দিন ২০০৩ ও ২০০৮ সালেও বাংলাদেশের ম্যাচ দেখতে মাঠে এসেছিলেন। এত বছর পর আবার একই মাঠে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দেখার সুযোগ তাঁর পরিবারের কাছে ছিল বিশেষ পুনর্মিলনের মতো। তাঁর স্ত্রীও বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে গর্ব প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘ বিরতির পর একই মাঠে দেশের ক্রিকেট দেখা তাঁদের পুরোনো স্মৃতিকে যেন নতুন করে ফিরিয়ে এনেছে।
এই কারণেই ডারউইনে বাংলাদেশের জয় অনেক প্রবাসীর কাছে ঈদের আনন্দের মতো মনে হয়েছে। কেউ দেশের পরিবারকে ফোন করেছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলেছেন, আবার কেউ ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত মোবাইলে ধরে রেখেছেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ দল এমন জয় পাবে—এই প্রত্যাশা হয়তো ম্যাচের আগে অনেকেরই ছিল না। কিন্তু জয় যখন এল, তখন সেটি হয়ে উঠল প্রবাসীদের জন্য বছরের অন্যতম স্মরণীয় ক্রিকেটীয় মুহূর্ত। গ্যালারিতে বাংলাদেশের পতাকা, সমর্থকদের উচ্ছ্বাস আর শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা মিলিয়ে তৈরি হয় অন্য রকম পরিবেশ।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ানদের জন্য দিনটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশের কাছে হারের পর হতাশা ছিল স্পষ্ট। সেই হতাশার ছবি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে মারারা স্টেডিয়ামের প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জে। টেস্টের আগের দিনগুলোয় যেখানে সাবেক ক্রিকেটার, কর্মকর্তা ও অতিথিদের আনাগোনায় লাউঞ্জ জমজমাট ছিল, সেদিন সেটি ছিল প্রায় ফাঁকা। এমনকি খাবার ও পানীয়ের আয়োজনও ছিল না। কারণ, আয়োজকেরা ধরে নিয়েছিলেন ম্যাচটি হয়তো চতুর্থ দিনে গড়াবে না। সেই ধারণায় চতুর্থ দিনের লাউঞ্জের টিকিটও কেউ কাটেননি।
শেষ পর্যন্ত টেস্ট চতুর্থ দিনে গড়ালেও অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নতুন করে লাউঞ্জের টিকিট বিক্রির আগ্রহও দেখা যায়নি। তাই আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, চতুর্থ দিন প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জ বন্ধ থাকবে। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের মাঠ ছাড়ার সময়ও হতাশা ফুটে উঠেছিল তাঁদের মুখে। কেউ দলীয় বাসে, কেউ ব্যক্তিগত গাড়িতে স্টেডিয়াম ছেড়েছেন। বিপরীতে বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা একসঙ্গে টিম বাসে উঠেছেন, সঙ্গে ছিল ঐতিহাসিক জয়ের উচ্ছ্বাস।
বাস ছাড়ার আগে বাংলাদেশ দলের ভেতর থেকেও শোনা যায় স্মৃতি ধরে রাখার আহ্বান—মোবাইলে থাকা সব ছবি একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার কথা বলা হয়। এমন একটি জয় যে তাঁদের ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। একইভাবে মাঠে উপস্থিত প্রবাসীরাও ডারউইন থেকে ফিরেছেন অমূল্য স্মৃতি নিয়ে। বাংলাদেশের জয় তাঁদের কাছে শুধু একটি ক্রিকেট ফল নয়; এটি ছিল দেশকে কাছে পাওয়ার, একসঙ্গে আনন্দ করার এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা উঁচু করে ধরার এক অসাধারণ দিন।



























