গ্রামীণ নারীদের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে নিরলস পরিশ্রম করছেন বরিশালের প্রত্যন্ত এলাকার অনেক নারী। কেউ শীতলপাটি বুনছেন, কেউ গরু পালন করছেন, আবার কেউ হাঁস মুরগি লালনপালন কিংবা সেলাইয়ের কাজ করে সংসারে অবদান রাখছেন। আয় খুব বেশি না হলেও তাদের এই উদ্যোগ পরিবারে স্বস্তি ফেরানোর পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস জোগাচ্ছে। সংসারের দায়িত্ব সামলে নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তারা হয়ে উঠছেন পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহায়।
বরিশালের চরমোনাই ইউনিয়নের রাজারচরের বাসিন্দা অমলা রানী শীতলপাটি বুনে আয় করেন। যোগাযোগব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও সংসারের কাজের ফাঁকে তিনি এ পেশা ধরে রেখেছেন। একটি পাটি তৈরি করতে তার তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। পরিশ্রম বেশি হলেও এই কাজের মাধ্যমে পরিবারের জন্য কিছু আয় করতে পারছেন তিনি। অমলা রানীর কাছে শীতলপাটি বোনা শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখার মাধ্যম নয়, বরং সংসারের পাশে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ। তার মতো আরও অনেক নারী গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী এই কাজকে জীবিকার অংশ করে নিয়েছেন।
গ্রামীণ নারীদের আয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম গরু পালন। সংসারের দৈনন্দিন কাজ সামলে গরুর পরিচর্যা করেন নাজমা। তার আশা, নিয়মিত যত্ন ও পরিশ্রমের মাধ্যমে গবাদিপশু পালন করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারবেন। তবে গরু পালনে খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার খরচ রয়েছে। তারপরও বাড়তি আয়ের আশায় এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। অন্যদিকে, সালমা বাড়ির আঙিনায় হাঁস-মুরগি পালন করেন। ডিম ও মুরগি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে কাজে লাগান। অল্প পরিসরে শুরু করা এই উদ্যোগও তার সংসারে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে।
সেলাইয়ের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন সুরাইয়া। বাড়ির কাজ শেষ করে অবসর সময়ে সেলাই মেশিনে পোশাক তৈরির কাজ করেন তিনি। এতে বাড়ির বাইরে না গিয়েও আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। অমলা রানী, নাজমা, সালমা ও সুরাইয়ার কাজের ধরন আলাদা হলেও তাদের লক্ষ্য একই নিজেদের শ্রমের মাধ্যমে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। এসব উদ্যোগ শুধু সংসারের খরচ জোগাতে সাহায্য করছে না, বরং নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতেও ভূমিকা রাখছে। নিজেদের উপার্জন থেকে সন্তানদের চাহিদা পূরণ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচে অবদান রাখতে পারা তাদের কাছে বড় প্রাপ্তি।
তবে গ্রামীণ নারীদের এই পথ সহজ নয়। পর্যাপ্ত পুঁজি, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং বাজারজাতকরণের সুযোগের অভাব তাদের কাজ সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করে। অনেক নারী নিজের দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে ব্যবসা বড় করতে পারেন না। আবার সংসারের কাজ ও আয়মূলক কাজ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয় তাদের। এসব সমস্যা কমাতে সহজ শর্তে ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রির সুযোগ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা পেলে নারীরা নিজেদের উদ্যোগ আরও এগিয়ে নিতে পারবেন।
সব মিলিয়ে, গ্রামীণ নারীদের আয় শুধু পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির বিষয় নয়; এটি আত্মনির্ভরতা, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক মর্যাদা অর্জনেরও একটি পথ। বাড়ির আঙিনা কিংবা ঘরের এক কোণে বসেই এসব নারী নিজেদের শ্রমকে সম্পদে রূপান্তর করছেন। তাদের আয় হয়তো সীমিত, কিন্তু পরিবারের জন্য সেই অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও বাজারের সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে তাদের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে। বরিশালের এসব পরিশ্রমী নারীর জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে, সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে গ্রামের নারীরাও নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন