কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তারকাদের মুখ বসিয়ে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও তৈরি এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। তাঁর প্রশ্ন, অন্য একজন মানুষের অপমান ও অসম্মান কবে থেকে মানুষের উপার্জনের মাধ্যম হয়ে উঠল? ভিউ, লাইক ও শেয়ারের জন্য এ ধরনের কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়াকে অন্যায় উল্লেখ করে ব্যবহারকারীদের নৈতিক দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে এআই দিয়ে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন মেহজাবীন। তাঁর মতে, শুধু আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করাই অপরাধ নয়, জেনেশুনে সেগুলো শেয়ার করে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও দায় রয়েছে। এ ধরনের প্রবণতা সমাজের মূল্যবোধ ও মানুষের বিবেকবোধ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
গত ১৩ অক্টোবর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে মেহজাবীন ও অভিনেত্রী পরীমনিকে ঘিরে আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশিত হয়। পরে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল। অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের পর সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
ঘটনাটি অনুসন্ধান করে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আলোচিত ভিডিওগুলো আসল নয়। অন্য ভিডিওতে ফেস সোয়াপ প্রযুক্তির মাধ্যমে দুই অভিনেত্রীর মুখ বসিয়ে সেগুলো তৈরি করা হয়েছে। ফলে ভিডিওগুলোকে তাঁদের বাস্তব কর্মকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে দেখার কোনো ভিত্তি নেই।
নিজের পোস্টে মেহজাবীন লিখেছেন, ‘এআই ব্যবহার করে কারও নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি করা এবং কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া কোনো বিনোদন নয়। এটি একটি অপরাধ।’ তাঁর বক্তব্য, এ ধরনের কনটেন্ট যখন শত শত কিংবা হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করেন, তখন বিষয়টি আর শুধু একজনের অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা বড় সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়।
অন্যকে সম্মান করার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের উদাহরণ টেনে সচেতন করার প্রচলিত পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিনেত্রী। তিনি লিখেছেন, ‘কারণ কাউকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে, তাকে আমাদের পরিবারের সদস্য হতে হবে কেন?’ তাঁর মতে, একজন মানুষের মর্যাদা রক্ষার জন্য তাঁকে নিজের পরিবারের সদস্য হিসেবে কল্পনা করার প্রয়োজন হওয়া উচিত নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতাকেও উদ্বেগজনক বলে মনে করেন মেহজাবীন। তাঁর মতে, ট্রেন্ডিংয়ে থাকা, বেশি ভিউ পাওয়া কিংবা কয়েক ডলার আয়ের আশায় অন্যের সম্মানহানি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কনটেন্ট তৈরি করে জীবিকা নির্বাহের বাস্তবতা স্বীকার করলেও সেই প্রয়োজনে কাউকে অপমান করার অধিকার কারও নেই।
মেহজাবীনের উদ্বেগের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে তাঁদের ভূমিকা, যাঁরা নিজেরা এসব ভুয়া ভিডিও তৈরি না করেও সেগুলো ছড়িয়ে দেন। কেউ শেয়ার করেন, কেউ মন্তব্য করেন, আবার কেউ অন্যদের দেখার সুযোগ করে দেন। এতে অপমানজনক কনটেন্ট আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং ভুক্তভোগীর ক্ষতি বাড়তে পারে।
এর আগেও এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে সরব হয়েছিলেন মেহজাবীন। তারকাদের ছবি ও ভিডিও বিকৃত করে প্রচারের ঘটনায় কঠোর আইন, জনসচেতনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন তিনি। এবারও প্রযুক্তির অপব্যবহারের পাশাপাশি অন্যায় কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অভিনেত্রী।
পোস্টের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবার আহ্বান জানান মেহজাবীন। তাঁর বক্তব্য, অন্যায় কনটেন্ট তৈরি না করলেও সেটি ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কেউ সেই অপরাধের অংশ হয়ে উঠতে পারেন। তাই ভিউ কিংবা জনপ্রিয়তার জন্য কিছু শেয়ার করার আগে তার প্রভাব ও নৈতিক দিক বিবেচনা করা জরুরি।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন