লিসে ক্লাভেনেস নামটি এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে নতুন করে আলোচনায়। কারণ, নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের এই সভাপতি সরাসরি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেছেন। শুধু সমালোচনা নয়, ফিফার বর্তমান নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলে আসছেন তিনি। ফলে ইনফান্তিনো যদি আগামী দিনে ফিফার নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান, সম্ভাব্য বিকল্পদের আলোচনায় লিসে ক্লাভেনেসের নামও উঠে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত তিনি নিজে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিফা সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেননি।
লিসে ক্লাভেনেসের গল্পটা শুধু ফুটবল প্রশাসনের নয়, মাঠের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক বেশ পুরোনো। পেশায় আইনজীবী এই নরওয়েজিয়ান একসময় ফুটবলার ছিলেন এবং নরওয়ে জাতীয় দলের হয়েও খেলেছেন। ২০২২ সালে তিনি নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়ে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। কাতারে বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। পরে ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনের বিরোধিতা করে নরওয়ে। নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের বর্তমান তথ্যেও ক্লাভেনেসকে সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইনফান্তিনোর সঙ্গে লিসে ক্লাভেনেসের দূরত্ব সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেড়েছে। ফিফার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন একাধিক আপত্তি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফিফার শান্তি পুরস্কার দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার ফোলারিন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য ফিফার প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা। নরওয়ের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে ফিফার এথিকস কমিটির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। চলতি মাসেই ক্লাভেনেস আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে আস্থার জায়গাটি নষ্ট হয়েছে এবং তাঁর সরে দাঁড়ানো উচিত।
তবে ক্লাভেনেসের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তাঁর অবস্থানের ধারাবাহিকতা। তিনি শুধু ইনফান্তিনোর বিরোধিতা করছেন না, বরং ফুটবল প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের কথা বলছেন। ২০২৬ সালে নরওয়ের জাতীয় দল বিশ্বকাপে দারুণ পারফরম্যান্স করে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ওঠায় দেশটির ফুটবল প্রশাসনও বাড়তি আত্মবিশ্বাস পেয়েছে। নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, বিশ্বকাপ ঘিরে দেশজুড়ে যে ঐক্য ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা ছিল ব্যতিক্রমী। এই সাফল্য ক্লাভেনেসের নেতৃত্বকে ঘরোয়া পর্যায়েও শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
তবে ফিফার সভাপতি হওয়ার পথ তাঁর জন্য সহজ নয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সমর্থন পাওয়ার জন্য শুধু ইউরোপের শক্তি যথেষ্ট নয়; আফ্রিকা, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের ভোটও গুরুত্বপূর্ণ। ক্লাভেনেস অতীতে উয়েফার নির্বাহী কমিটির নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। পরে নারীদের জন্য নির্ধারিত আসনে তিনি উয়েফার নির্বাহী কমিটিতে জায়গা পান। ফলে বৈশ্বিক পর্যায়ে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটা, সেটিই হতে পারে বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে ইউরোপের বাইরের অনেক ফুটবল ফেডারেশন তাঁকে অতিরিক্ত উদারপন্থী হিসেবে দেখলে তাঁর জন্য ভোটের সমীকরণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখনো ফিফা সভাপতি পদের দৌড়ে ইনফান্তিনোই একমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত প্রার্থী। আগামী বছরের মার্চে ফিফা কংগ্রেসে নির্বাচন হওয়ার কথা। লিসে ক্লাভেনেস এখনো প্রার্থিতা ঘোষণা না করলেও তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক ফুটবলে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি সত্যিই প্রার্থী হলে লড়াইটি শুধু একজন সভাপতি বনাম একজন চ্যালেঞ্জারের হবে না; বরং ফিফা কোন ধরনের নেতৃত্ব চায়, সেই প্রশ্নও সামনে চলে আসবে। আর সেই কারণেই ৪৫ বছর বয়সী এই সাবেক ফুটবলার এখন ইনফান্তিনোর পথের অন্যতম আলোচিত কাঁটা।




























