বিশ্ব ফুটবলে লিওনেল মেসি মানেই অসাধারণ প্রতিভা, একের পর এক রেকর্ড আর কোটি মানুষের ভালোবাসা। কিন্তু ছোটবেলায় তাঁর এই স্বপ্নের পথ মোটেও সহজ ছিল না। মাত্র ১১ বছর বয়সে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ে আর্জেন্টাইন মহাতারকার। ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছিল তাঁর পরিবার। একসময় অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় ফুটবলকে ঘিরে দেখা স্বপ্নও। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে মেসির জীবনে আশার আলো হয়ে আসে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা।

আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে জন্ম নেওয়া মেসির ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ছিল ছোটবেলা থেকেই। মাত্র চার বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব গ্রানদোলিতে খেলা শুরু করেন তিনি। এরপর আট বছর বয়সে যোগ দেন নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের বয়সভিত্তিক দলে। ছোটখাটো গড়নের এই ছেলেটি বল পায়ে নিজের অসাধারণ দক্ষতা দিয়ে সবার নজর কাড়ছিলেন। বয়সে বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও তাঁর ড্রিবলিং ও বল নিয়ন্ত্রণ ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু মাঠের এই প্রতিভার আড়ালেই বাড়ছিল একটি শারীরিক সমস্যা।

বাধা হয়ে দাঁড়ায় গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি

চিকিৎসকদের পরীক্ষায় মেসির শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ে। এই সমস্যার কারণে তাঁর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছিল। প্রয়োজন ছিল নিয়মিত হরমোনের চিকিৎসা, যার অংশ হিসেবে প্রতিদিন পায়ে ইনজেকশন নিতে হতো তাঁকে। ছোট্ট মেসির জন্য চিকিৎসাটি শারীরিক ও মানসিকভাবে সহজ ছিল না। নিজের জীবনীতে মেসিও জানিয়েছেন, চিকিৎসার শুরুতে ইনজেকশন নেওয়া বেশ যন্ত্রণাদায়ক ছিল।

তবে সমস্যাটি শুধু চিকিৎসার কষ্টেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় এর ব্যয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময় চিকিৎসার জন্য মাসে প্রায় এক হাজার ইউরো পর্যন্ত খরচের কথা বলা হয়েছিল। মেসির বাবা হোর্হে মেসি একটি ধাতু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। পরিবারের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে এত ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

লিওনেল মেসি
লিওনেল মেসির শৈশব

প্রথমদিকে চিকিৎসার কিছু খরচের ব্যবস্থা হলেও সেই সহায়তা স্থায়ী হয়নি। নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের পক্ষ থেকেও চিকিৎসার ব্যয় বহনের বিষয়ে প্রত্যাশিত সহায়তা পাওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে মেসির পরিবারকে বিকল্প পথ খুঁজতে হয়। প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার খরচ তাঁর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছিল। সেই সময়ই ইউরোপে যাওয়ার সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় আসে।

যেভাবে মেসির পাশে দাঁড়ায় বার্সেলোনা

২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনায় পরীক্ষামূলকভাবে খেলার সুযোগ পান মেসি। ক্লাবটির কর্মকর্তারা তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হন। বিশেষ করে বার্সেলোনার তৎকালীন ক্রীড়া পরিচালক কার্লেস রেক্সাচ মেসিকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, বার্সেলোনা তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসার খরচ বহন করতেও রাজি হয়। এভাবেই ফুটবল খেলার সুযোগের পাশাপাশি চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পথ খুলে যায় তাঁর সামনে।

লিওনেল মেসি
লিওনেল মেসি

মেসির বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার গল্পে একটি ন্যাপকিনের কথাও বিখ্যাত হয়ে আছে। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, মেসিকে দলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ন্যাপকিনে লিখে দিয়েছিলেন রেক্সাচ। পরে আনুষ্ঠানিক চুক্তি ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বার্সেলোনার যুবদলে জায়গা পান আর্জেন্টাইন কিশোর। পরিবারের সঙ্গে স্পেনে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্তটি ছিল বড় ঝুঁকির। পরিচিত পরিবেশ, বন্ধু ও আত্মীয়দের ছেড়ে নতুন দেশে মানিয়ে নেওয়াও সহজ ছিল না।

অনিশ্চয়তা পেরিয়ে বিশ্বসেরার মঞ্চে

বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পরও মেসির পথ পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকা এবং চোটের মতো বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। তবু ফুটবলের প্রতি নিষ্ঠা ও নিয়মিত পরিশ্রম তাঁকে এগিয়ে নেয়। বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে একসময় বার্সেলোনার মূল দলে জায়গা করে নেন তিনি। এরপর একের পর এক সাফল্য তাঁকে পরিণত করে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে।

মেসির শৈশবের এই গল্প শুধু একজন ফুটবলারের সাফল্যের কাহিনি নয়, বরং প্রতিভা, পরিবারের সংগ্রাম এবং সঠিক সময়ে পাওয়া সহায়তার গুরুত্বও তুলে ধরে। যে শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর ফুটবল-স্বপ্ন একসময় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, সেই বাধা অতিক্রম করেই তিনি পৌঁছেছেন বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসনে। তাঁর যাত্রা মনে করিয়ে দেয়, বড় স্বপ্ন পূরণে প্রতিভার পাশাপাশি প্রয়োজন অধ্যবসায়, সুযোগ ও কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানো মানুষের সহযোগিতা।