বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত তারকাদের একজন কিলিয়ান এমবাপ্পে। দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার পর তাকে দলে ভেড়ায় স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ। সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল, এমবাপ্পেকে ঘিরে নতুন এক সোনালি অধ্যায় শুরু হবে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা যেন এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প বলছে। ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত গোলসংখ্যা থাকার পরও দলীয় ব্যর্থতায় এখন সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফরাসি এই তারকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি “এমবাপ্পেকে বাদ দাও” শিরোনামে একটি প্রচারণা ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। দাবি করা হচ্ছে, এতে তিন কোটির বেশি স্বাক্ষর জমা পড়েছে।
যদিও এই সংখ্যার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও বিষয়টি স্পষ্ট করে যে রিয়াল সমর্থকদের একটি বড় অংশ বর্তমানে এমবাপ্পের প্রতি বিরক্ত। মাত্র দুই মৌসুমে ৮৫ গোল করেছেন এমবাপ্পে। যেকোনো ক্লাবের জন্য এটি অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য যথেষ্ট নয়। এখানে শিরোপাই শেষ কথা। সমর্থকদের অভিযোগ, এমবাপ্পে আসার পরও দল বড় কোনো ট্রফি জিততে পারেনি। বরং প্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা আবারও নিজেদের শক্ত অবস্থানে ফিরে গেছে।
রিয়ালের ব্যর্থতার পেছনে কেবল এমবাপ্পেকে দায়ী করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেক ফুটবল বিশ্লেষক মনে করছেন, ক্লাবের ভেতরের বড় সমস্যাগুলো আড়াল করতেই এমবাপ্পেকে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। দলের মাঝমাঠে ভারসাম্যের অভাব, রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং কৌশলগত সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। কিন্তু বড় তারকা হওয়ায় সব চাপ এসে পড়ছে এমবাপ্পের কাঁধে। সম্প্রতি একটি ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট থেকে পুনর্বাসনের সময় ব্যক্তিগত বিমানে ইতালির সার্ডিনিয়ায় ছুটি কাটাতে যান এমবাপ্পে। সঙ্গে ছিলেন তার প্রেমিকা এস্তের এক্সপোসিতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই সফরের ছবি ছড়িয়ে পড়তেই সমর্থকদের একাংশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়।
সমর্থকদের অভিযোগ, মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এবং এল ক্লাসিকোর মতো বড় ম্যাচের আগে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের এমন ব্যক্তিগত সফর দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়। অনেকের মতে, এই আচরণ দলীয় সংকটের সময়ে সমর্থকদের আবেগকে আরও আহত করেছে। এদিকে এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে নিয়ে গড়া আক্রমণভাগ নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে। কাগজে-কলমে এই জুটি বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগ মনে হলেও মাঠে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য দেখা যাচ্ছে না। দুজনই স্বাধীনভাবে খেলতে পছন্দ করেন এবং বল পায়ে রেখে আক্রমণ গড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
আধুনিক ফুটবলে শুধু আক্রমণ নয়, পুরো দলকে সমানভাবে রক্ষণে অংশ নিতে হয়। কিন্তু এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়াসের খেলার ধরন অনেক সময় সেই ভারসাম্য নষ্ট করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে দলের সামগ্রিক ছন্দ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ের সাম্প্রতিক সাফল্যও এমবাপ্পের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। এমবাপ্পে ক্লাব ছাড়ার পরই ফরাসি ক্লাবটি প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে এবং আবারও ফাইনালে পৌঁছে যায়। এতে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এমবাপ্পে চলে যাওয়ার পর পিএসজি কি আরও দলগত ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে?
এই তুলনা রিয়াল সমর্থকদের মধ্যেও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, বড় তারকা নির্ভরতার বদলে দলীয় সমন্বয়ই আধুনিক ফুটবলে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এমবাপ্পেকে ঘিরে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত নির্ভরতা রিয়ালের জন্য উল্টো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সব সমালোচনার মধ্যেও এমবাপ্পেকে বিক্রি করা সহজ নয়। তার সঙ্গে রিয়ালের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। এছাড়া তার বিশাল বেতন, বোনাস এবং সম্ভাব্য দলবদল মূল্য ইউরোপের অধিকাংশ ক্লাবের নাগালের বাইরে। প্রায় ২০ কোটি পাউন্ডের সম্ভাব্য দলবদল ব্যয় বহন করা খুব কম ক্লাবের পক্ষেই সম্ভব।
ফলে বাস্তবতা হচ্ছে, রিয়াল মাদ্রিদকে এমবাপ্পেকে নিয়েই সমাধান খুঁজতে হবে। ক্লাবের কৌশলগত পরিবর্তন, খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয় এবং ড্রেসিংরুমের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার দিকেই এখন বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফুটবল ইতিহাসে রিয়াল মাদ্রিদ সবসময়ই তারকাসমৃদ্ধ দল গড়ার জন্য পরিচিত। কিন্তু অতীতেও দেখা গেছে, শুধু বড় তারকা দিয়ে সফল দল গড়া সম্ভব হয় না। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, ভারসাম্য এবং দলীয় বোঝাপড়া। বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে এমবাপ্পেকে ঘিরে চলমান বিতর্ক শুধু একজন ফুটবলারের পারফরম্যান্স নিয়ে নয়। এটি রিয়াল মাদ্রিদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, দল গঠনের কৌশল এবং ক্লাবের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সময়ের সঙ্গে এই সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয় কিনা, নাকি ফুটবল বিশ্ব আরেকটি আলোচিত বিচ্ছেদের সাক্ষী হতে যাচ্ছে।
























