যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির (Agreement on Reciprocal Trade–ART) বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। সোমবার (৪ মে ২০২৬) সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী এ রিট আবেদন করেন। বিষয়টি ঘিরে ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিক ও নীতিগত নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
রিট আবেদনকারী আইনজীবী মোহাম্মদ মাইদুল ইসলাম। তাঁর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুবীর নন্দী দাস হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদনটি জমা দেন। জানা গেছে, বিচারপতি আহমেদ সোহেলের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে আগামীকাল রিটটি উত্থাপন করা হবে।
প্রসঙ্গত, গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটির লক্ষ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ করা এবং নির্দিষ্ট খাতে পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। তবে চুক্তির বিভিন্ন ধারা নিয়ে শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ ও আইনজীবীদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়।
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তিটি একপাক্ষিক এবং বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। আবেদনকারীর দাবি, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর ১৩১টি বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে মাত্র ৬টি বিষয়ে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই বৈষম্যকে “অযৌক্তিক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনজীবী সুবীর নন্দী দাস গণমাধ্যমকে বলেন, চুক্তির শর্তাবলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাঁর ভাষায়, “এই চুক্তি কার্যকর হলে দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এটি এমন একটি কাঠামো তৈরি করে, যেখানে বাংলাদেশের ওপর চাপ বেশি, কিন্তু সুবিধা তুলনামূলক কম।”
তিনি আরও বলেন, চুক্তিটি শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই নয়, বরং সাধারণ জনগণের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় শিল্প, কৃষি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিটের প্রার্থনায় হাইকোর্টের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে—বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই Agreement on Reciprocal Trade (ART) কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে রুল জারি হলে চুক্তির আওতায় যেকোনো ধরনের লিখিত নোটিফিকেশন ইস্যু এবং দুই দেশের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
রিটে বিবাদী করা হয়েছে পররাষ্ট্র, অর্থ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবদের। আবেদনকারীর অভিযোগ, চুক্তি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেশের জাতীয় স্বার্থ এবং জনকল্যাণ যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি সাধারণত দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে করা হয়। তবে যদি কোনো চুক্তিতে ভারসাম্যহীনতা থাকে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে সংসদীয় পর্যালোচনা এবং বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, আদালতের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করেই চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
এদিকে ব্যবসায়ী মহলেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, চুক্তির শর্তাবলি পরিষ্কারভাবে প্রকাশ এবং জনমত যাচাই ছাড়া এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হয়নি। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো এই চুক্তির ফলে কী ধরনের সুবিধা বা অসুবিধার মুখে পড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের এই পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি এখন আইনি ও নীতিগত পরীক্ষার মুখে পড়েছে। হাইকোর্টের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, চুক্তিটি বহাল থাকবে নাকি বাতিলের পথে যাবে। ফলে আগামী দিনের অর্থনৈতিক কৌশল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

























